ক্রিকেটের আভিজাত্য ধরে রাখতে টেস্ট ম্যাচে লাল বলের ব্যবহার বহুদিনের প্রথা। ওয়ানডে বা টি-টোয়েন্টিতে সাদা বল এবং দিনরাতের টেস্টে গোলাপি বলের প্রচলন থাকলেও, দিনের বেলার টেস্টে গোলাপি বলের ব্যবহার নিয়ে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। সম্প্রতি দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম টেস্ট ম্যাচে প্রকৃতির বৈরিতা ও আলোর স্বল্পতার কারণে বারবার খেলা ব্যাহত হওয়ার ঘটনা এই আলোচনাকে আরও জোরালো করেছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) ১ অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়া নতুন প্লেয়িং কন্ডিশন অনুযায়ী, দিনের টেস্টেও গোলাপি বল ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে শর্ত হলো, ম্যাচ শুরুর আগেই দুই দলকে গোলাপি বলের ব্যাপারে একমত হতে হবে এবং পুরো ম্যাচ সেই বলেই খেলতে হবে, কারণ ম্যাচের মাঝে লাল থেকে গোলাপি বল পরিবর্তনের সুযোগ নেই। অথচ এই সমস্যার একটা সমাধান আগেই দিয়ে রেখেছিল আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি)। ডারবানে অবশ্য এই সুযোগ কাজে লাগায়নি কোনো দলই। প্রথমে শোনা গিয়েছিল, দক্ষিণ আফ্রিকার অনীহার কারণেই ডারবানে গোলাপি বল ব্যবহার করা হয়নি।
কিংসমিডে অনুষ্ঠিত প্রথম টেস্টের প্রথম দিনে আলোর স্বল্পতার কারণে মাত্র ৬৫ ওভার খেলা হয়েছে, যেখানে টেস্ট ক্রিকেটে প্রতিদিন অন্তত ৯০ ওভার খেলা হওয়ার কথা। অর্থাৎ, প্রথম দিনেই ২৫ ওভারের খেলা নষ্ট হয়েছে। দ্বিতীয় দিনেও আলোর অভাবে নির্ধারিত সময়ের আগেই খেলা শেষ করতে হয়েছে। অস্ট্রেলিয়া প্রথম ইনিংসে ৩৯০ রান করার পর দক্ষিণ আফ্রিকা ১ উইকেটে ২৭ রান সংগ্রহ করে। ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়া ২১৪ রানে জিতে নিলেও, গোলাপি বল ব্যবহারের বিষয়টি ফের আলোচনায় এসেছে। প্রশ্ন উঠেছে, গোলাপি বল ব্যবহার করলে কি এই মূল্যবান সময়গুলো বাঁচানো সম্ভব হতো? কিন্তু জয়ের আনন্দেও চাপা পড়েনি একটি প্রশ্ন। আবার ব্যাটসম্যানরা রান পেলে বলা হয়, বল নরম হয়ে গেছে। সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে ৩৯০ রান করেছে দলটি। এক দিনের নির্ধারিত খেলার ঠিক অর্ধেক।
ম্যাচ শেষে অস্ট্রেলিয়ার কোচ অ্যান্ড্রু ম্যাকডোনাল্ড স্পষ্ট করেছেন যে, অস্ট্রেলিয়া গোলাপি বল ব্যবহারের পক্ষে নয়। ম্যাকডোনাল্ড বলেন, 'আমার এটা পছন্দ নয়। লাল বলের বদলে গোলাপি বল ব্যবহার করাটা আমার কাছে কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ মনে হয়। সত্যি বলতে, আমাদের উত্তর “না”।' তিনি মূলত গোলাপি বলের আচরণ নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, ফ্লাডলাইটের নিচে গোলাপি বলের আচরণ এবং বল পুরোনো হওয়ার সঙ্গে এর পরিবর্তিত স্বভাব সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকাটা বড় ঝুঁকি। তবে অন্য দলগুলোকে তিনি নিরুৎসাহিত করছেন না, বরং সিদ্ধান্তটি তাদের ওপরই ছেড়ে দিয়েছেন। ক্রিকেটাররা মাঠ ছেড়েছেন, দর্শকেরা অপেক্ষা করেছেন। লাল বলের তুলনায় গোলাপি বলের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার আচরণ কেমন বদলায়, ফ্লাডলাইটের আলোয় সেটি কতটা ভিন্ন আচরণ করে, এসব নিয়ে তাঁর সংশয় আছে। এই নিয়মের মধ্যেই লুকিয়ে আছে সমস্যাটা।
অন্যদিকে, দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক অধিনায়ক শন পোলক গোলাপি বলের সম্ভাবনা দেখছেন। তিনি বলেন, 'আমি এক মুহূর্তের জন্যও বলছি না যে আমাদের গোলাপি বলে দিনরাতের ম্যাচ খেলা উচিত ছিল। আমি শুধু মনে করি, দিনের ম্যাচটিই গোলাপি বলে খেলা উচিত ছিল।' পোলকের দাবি, ক্রিকেটবিশ্বে গোলাপি বল নিয়ে একধরনের অহেতুক ভীতি রয়েছে। তাঁর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, লাল বলের কোনো ঘটনাকে ক্রিকেটের অংশ হিসেবে দেখা হলেও, গোলাপি বলে একই ঘটনা ঘটলে সেটিকে বলের দোষ হিসেবে দেখা হয়। ডারবানের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, অস্ট্রেলিয়া ৬ উইকেটে ১২৪ রানে থাকা অবস্থায় গোলাপি বল ব্যবহার করলে হয়তো সবাই বলের দোষ দিত। পোলকের মতে, গোলাপি বল ব্যবহার করলে ঐ টেস্টে বাড়তি ৪৫ ওভার খেলা সম্ভব হতো, যা ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারত। পোলক ক্রিকেটারদের গোলাপি বল ব্যবহার করতে ভয় না পাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন এবং দেখিয়েছেন যে আকাশ থেকে ছুড়ে দেওয়া অবস্থায় লাল বলের চেয়ে গোলাপি বা কমলা বল দেখা সহজ। পোলকের বক্তব্যের সারকথা, লাল বলকে আমরা যে ছাড় দিই, গোলাপি বলকে সেই ছাড় দিতে চাই না। টেস্ট ক্রিকেটে এই ৪৫ ওভারে কত কিছুই না ঘটে যেতে পারে। অন্যদিকে পোলকের যুক্তি, সেই আশঙ্কায় যদি ঘণ্টার পর ঘণ্টা ক্রিকেটই বন্ধ থাকে, তাহলে লাভটা কী।
আইসিসির নতুন প্লেয়িং কন্ডিশন অনুযায়ী দুই দলের সম্মতি ছাড়া গোলাপি বল ব্যবহার করা সম্ভব নয়। এখন ক্রিকেটপ্রেমীদের নজর ১৮ অক্টোবর গেবেরহায় শুরু হতে যাওয়া দ্বিতীয় টেস্টের দিকে। এরপর কেপটাউনে সিরিজের শেষ ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। যদি আবারও আকাশ মেঘলা হয় বা আলো কমে আসে, তবে গোলাপি বলের প্রসঙ্গটি আবারও সামনে আসবে। দুই দল একমত না হওয়া পর্যন্ত ক্রিকেটের পুরোনো অভ্যাস বনাম নতুন বাস্তবতার এই বিতর্ক চলতে থাকবে। ক্রিকেটের সবচেয়ে পুরোনো সংস্করণে এমন ভাবনাটাই এখন নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। কারণ, সেখানে ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ হয়ে উঠেছিল প্রকৃতি।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ আশরাফুল জাহান শাওলিন। যোগাযোগঃ হোল্ডিং নং- ০১, ( আব্দুর রব মঞ্জিল), ঘোষপাড়া, মতলব দক্ষিণ, চাঁদপুর- ৩৬৪০। ই-মেইলঃ ajshawlin2007@gmail.com, মোবাইলঃ 01920565995
Design & Developed by Soft-Mack IT