মঙ্গলবার উত্তর ২৪ পরগনার গাইঘাটা এবং মুর্শিদাবাদের ধুলিয়ানে পুলিশের গুলিতে দুই অভিযুক্তের মৃত্যুর ঘটনায় রাজ্যজুড়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অপরাধ দমনের নামে উত্তরপ্রদেশ বা আসামের আদলে ‘এনকাউন্টার’ সংস্কৃতি রাজ্যে শুরু হয়েছে কি না, তা নিয়ে সরব হয়েছেন রাজনীতিক থেকে শুরু করে মানবাধিকার কর্মীরা। পুলিশের দাবি, দুটি ক্ষেত্রেই অভিযুক্তরা হেফাজত থেকে পুলিশের আগ্নেয়াস্ত্র কেড়ে নিয়ে পালানোর চেষ্টা করলে পাল্টা গুলিতে তাদের মৃত্যু হয়। কিন্তু এই জোড়া ঘটনার ধরন ও সময়কাল নিয়ে জনমনে প্রবল সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। দুটি ঘটনাই যেন একে অপরের হুবহু ‘রি-মেক’।
গাইঘাটার ঘটনায় গত রোববার এক কিশোরীর নিথর দেহ উদ্ধারের পর প্রহ্লাদ দাস নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। ধর্ষণের পর খুনের অভিযোগে পুলিশ ওই পরিবারেরই আত্মীয় প্রহ্লাদ দাসকে গ্রেপ্তার করে।
পুলিশের ভাষ্যমতে, মঙ্গলবার ভোররাতে ঘটনার পুনর্নির্মাণ শেষে ফেরার পথে বৈদ্যবাড়ি এলাকায় অভিযুক্ত পুলিশকর্মীর বন্দুক ছিনিয়ে নিয়ে গুলি চালান।
এরপর পুলিশ চার রাউন্ড পাল্টা গুলি চালালে তার মৃত্যু হয়। অন্যদিকে, ধুলিয়ানে ব্যবসায়ী সুজিত মণ্ডল হত্যার প্রধান অভিযুক্ত সামাউল শেখকে নিয়ে দুপুরে সিআইডি ঘটনার পুনর্নির্মাণে গিয়েছিল। সেখানে সামাউল পুলিশের রিভলভার কেড়ে নিয়ে পরপর তিন রাউন্ড গুলি চালান এবং ডিএসপি-কে নিশানা করেন বলে পুলিশের দাবি। আত্মরক্ষার্থে এক ইনস্পেক্টর অভিযুক্তের মাথায় গুলি করলে তিনি মারা যান। তবে ধুলিয়ানের ঘটনার সময় স্থানীয় বাসিন্দারা দাবি করেছেন, ঘটনাস্থলে কোনো গুলির শব্দ তারা শোনেননি। সাড়ে তিন মাস আগে বারুইপুরে এক অভিযুক্তের মৃত্যুর ঘটনার সঙ্গে বর্তমান এই দুটি ঘটনার নাটকীয় মিল খুঁজে পাচ্ছেন অনেকে। মঙ্গলবার ভোররাতে গাইঘাটায় এবং ভরদুপুরে ধুলিয়ানে ঘটা দুটি এনকাউন্টারের মধ্যে এমন কিছু আশ্চর্য মিল রয়েছে, যা দেখে অনেকেই চমকে উঠেছেন। সাড়ে তিন মাস আগে দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরে ১১ বছরের এক নাবালিকাকে ধর্ষণ ও খুনে অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডলের এনকাউন্টারের সঙ্গেও এই জোড়া ঘটনার অদ্ভুত মিল পাচ্ছেন অনেকে। গত ২৮ আগস্ট সামশেরগঞ্জের পুরাতন ডাকবাংলা এলাকার বাসিন্দা, ব্যবসায়ী তথা বিজেপি কর্মী সুজিত মণ্ডল নিখোঁজ হন এবং পরে তার খণ্ডবিখণ্ড লাশ উদ্ধার হয়। সামাউলের ভাড়াবাড়ি থেকে মাত্র ১০০ মিটার দূরের অকুস্থল ভুটু মার্কেটের বাসিন্দার দাবি, ভরদুপুরে ঘটনাটি ঘটলেও তারা কোনো গুলির শব্দই শুনতে পাননি। সামাউল ও তাজকিরা স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে ধুলিয়ানে একটি ভাড়াবাড়িতে থাকতেন। মুখ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে এরপর ধুলিয়ান টিওপি-র ইনচার্জ ও সামশেরগঞ্জ থানার সেকেন্ড অফিসারকে সাসপেন্ড করা হয় এবং জঙ্গিপুরের এসপি-সহ একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তাকে শাস্তির মুখে পড়তে হয়। গত শনিবার গাইঘাটা থানা এলাকার বাসিন্দা ১৭ বছরের এক কিশোরী রাতে জলসা দেখতে গিয়ে নিখোঁজ হয় এবং রোববার সকালে তার বিবস্ত্র, ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার হয়। তিনি কটাক্ষ করে বলেন, পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের যদি নিজেদের কোমরে রিভলভার রাখার ট্রেনিং না থাকে, তবে তারা কেমন পুলিশ।
রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে কঠোর বার্তা দেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বিধানসভায় দাঁড়িয়ে পুলিশকে নারী নির্যাতন ও নেশামুক্তির মতো ক্ষেত্রে পরিস্থিতি অনুযায়ী তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছেন। তিনি পুলিশকর্মীদের পাশে থাকার আশ্বাসও দিয়েছেন। মন্ত্রী দিলীপ ঘোষের মতে, জনমনে ভরসা ফেরাতে পুলিশকে মাঝে মাঝে কঠিন পদক্ষেপ নিতে হয়। এদিকে, আরজি কর হাসপাতালে নিহত চিকিৎসকের মা ও বিজেপি বিধায়ক রত্না দেবনাথ এই এনকাউন্টারকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে অভিযুক্তদের বেঁচে থাকার অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। অন্যদিকে, বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য ‘এনকাউন্টার’ শব্দটি এড়িয়ে এটিকে প্রাণ বাঁচাতে পুলিশের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে অতীতে ধুলিয়ানে হরগোবিন্দ দাস এবং চন্দন দাস হত্যাকাণ্ডের তুলনা টেনে জানিয়েছিলেন, পশুর মাংস কাটার ছুরি দিয়ে সুজিতকে খুন করা হয়েছে। জঙ্গিপুর মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে গেলে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট জানিয়েছেন, নতুন সরকারের আমলে পশ্চিমবঙ্গে অপরাধীরা ছাড় পাবে না। রাজ্যের পঞ্চায়েতমন্ত্রী দিলীপ ঘোষ যোগী আদিত্যনাথ বা হিমন্ত বিশ্বশর্মার সুরেই বলেছেন, মানুষের মনে ভরসা ফেরাতে পুলিশকে কিছু ‘অপ্রিয় কাজ’ করতে হবে।
বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো এই ঘটনায় সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছে। কংগ্রেস নেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরী পুলিশের অস্ত্র প্রশিক্ষণের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের প্রবণতায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তৃণমূল বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় মন্তব্য করেছেন যে, এনকাউন্টার করে কেবল প্রচার পাওয়া যায়, আইন নয়। সিপিএম নেতা মহম্মদ সেলিম এই ঘটনাগুলোকে সস্তা ‘সোপ অপেরা’ বলে অভিহিত করেছেন। এছাড়া মানবাধিকার সংগঠন এপিডিআর-এর রঞ্জিত শূর গভীর রাতে অভিযুক্তকে নিয়ে পুলিশের ঘটনার পুনর্নির্মাণে যাওয়ার তত্ত্বকে অবাস্তব বলে মন্তব্য করেছেন। সুজিত মণ্ডল হত্যায় এর আগে পুলিশের গাফিলতির অভিযোগে কয়েকজন কর্মকর্তাকে সাসপেন্ডও করা হয়েছিল। গাইঘাটা ও ধুলিয়ানের এই ঘটনা দুটি এখন রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও পুলিশি স্বচ্ছতা নিয়ে বড় ধরনের বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অপরাধীদের শায়েস্তা করার নামে এই জোড়া এনকাউন্টারের পর প্রশ্ন উঠছে, এটি কি নিছকই পুলিশের আত্মরক্ষা, নাকি বিচার ব্যবস্থাকে এড়িয়ে সরাসরি অভিযুক্তকে নিকেশ করার কোনো সাজানো চিত্রনাট্য। উভয় ক্ষেত্রেই পুলিশ হেফাজতে থাকা অভিযুক্তকে নিয়ে ঘটনার পুনর্নির্মাণের জন্য নির্জন অকুস্থলে যায় পুলিশ। মুর্শিদাবাদের ধুলিয়ানের ঘটনাটি রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক দিক থেকে অত্যন্ত স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে। উল্লেখ্য, সুজিত খুনে পুলিশের বিরুদ্ধে কর্তব্যে গাফিলতির অভিযোগ তুলেছিলেন নিহতের স্ত্রী সুমনা মণ্ডল। রাজ্যের পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালও বারুইপুর এনকাউন্টারের পর অপরাধীদের কড়া বার্তা দিয়েছিলেন। সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম এই ঘটনাগুলিকে সস্তা ‘সোপ অপেরা এপিসোড’ বলে তোপ দেগেছেন, যা দিয়ে আদতে অপরাধ কমানো সম্ভব নয়।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ আশরাফুল জাহান শাওলিন। যোগাযোগঃ হোল্ডিং নং- ০১, ( আব্দুর রব মঞ্জিল), ঘোষপাড়া, মতলব দক্ষিণ, চাঁদপুর- ৩৬৪০। ই-মেইলঃ ajshawlin2007@gmail.com, মোবাইলঃ 01920565995
Design & Developed by Soft-Mack IT