
মানিকগঞ্জের সিংগাইরে তিনজনকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার দায়ে পাঁচ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং আটজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেছে আদালত। একই মামলায় আরও সাতজনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এছাড়া অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় চারজন আসামিকে খালাস প্রদান করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে মানিকগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক এস কে এম তোফায়েল হাসান জনাকীর্ণ আদালতে সব আসামির উপস্থিতিতে এই চাঞ্চল্যকর মামলার রায় ঘোষণা করেন। এ ছাড়া অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় এই মামলার চারজনকে খালাস দেওয়া হয়েছে।
মামলার নেপথ্যের ঘটনা ও সম্পত্তির বিরোধ
আদালত ও মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, হাসিনা নামের এক নারী দীর্ঘদিন বাহরাইনে বসবাস করতেন। অবিবাহিত এবং নিঃসন্তান হওয়ায় তার মৃত্যুর পর রেখে যাওয়া বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি ও অর্থের মালিকানা নিয়ে তার ভাই-বোনদের মধ্যে চরম বিরোধ দেখা দেয়। অভিযোগ রয়েছে যে, হাসিনার বোন রাজিয়া খাতুন, তার স্বামী ও ছেলেরা ওই সম্পত্তি ও অর্থ আইনবহির্ভূতভাবে এককভাবে ভোগদখল করতে শুরু করেন। এ নিয়ে পারিবারিকভাবে ও স্থানীয়ভাবে একাধিকবার সালিশ বৈঠক হলেও দীর্ঘস্থায়ী কোনো সমাধান পাওয়া যায়নি, যা শেষ পর্যন্ত নৃশংস হত্যাকাণ্ডের দিকে মোড় নেয়।
হত্যাকাণ্ডের বিবরণ
বিরোধ নিরসনের লক্ষ্যে ২০১৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সকাল ১০টায় একটি সালিশ বৈঠকের দিন নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০১৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সকাল ১০টায় এই বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য একটি সালিশ বৈঠকের দিন ধার্য করা হয়।
কিন্তু ওই দিন সকাল পৌনে ৮টার দিকে মামলার অন্যতম আসামি জসিম তার মামা টেঁন্ডুল মোল্লা, করিম মোল্লা ও আজিজ মোল্লাকে কৌশলে শামসুল হকের বাড়িতে ডেকে নেন।
সেখানে আগে থেকেই প্রস্তুত ছিলেন রাজিয়া খাতুনসহ অন্যান্যরা। অভিযোগ অনুযায়ী, রাজিয়া খাতুনের সরাসরি নির্দেশে জসিমসহ অভিযুক্তরা রামদা, সড়কি, লোহার রড ও বাঁশের লাঠি নিয়ে অতর্কিতভাবে তাদের ওপর হামলা চালান। এই নৃশংস হামলায় আজিজ মোল্লা, টেঁন্ডুল মোল্লা ও করিম মোল্লা গুরুতর আহত হন এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরবর্তী সময়ে তারা তিনজনই মারা যান। এ ঘটনার পরদিন ২০১৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ফরিদা আক্তার বাদী হয়ে সিংগাইর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। এরপর ২০১৭ সালের ২৮ এপ্রিল সিংগাইর থানার তৎকালীন পুলিশ পরিদর্শক আমিনুল ইসলাম ২৪ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ায় মোট ২১ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণের পর আজ এই রায় ঘোষণা করা হলো। এই মামলায় মোট ২১ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ ও আইনি প্রক্রিয়া শেষে আদালত আজ এই রায় ঘোষণা করলেন।
দণ্ডপ্রাপ্তদের তালিকা
- মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন: মো. জিয়ার উদ্দিন, মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম, আবদুর রশিদ, জসিম ও সিদ্দিক মিয়া। তাদের প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড ও অনাদায়ে আরও চার মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
- যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ৮ জন: মো. জহির উদ্দিন, আজিজুল, উজ্জ্বল, মো. শামসুল হক, সালাউদ্দিন, মাজেদ মিয়া, মো. মরণ ও স্বপন। তাদের প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে।
- অন্যান্য সাজা: শামীম ও হাবু মিয়াকে পাঁচ বছর সশ্রম কারাদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা জরিমানা (অনাদায়ে দুই মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড), মজনু মিয়াকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, রাজিয়া খাতুন ও সুফিয়া খাতুনকে ছয় মাস করে এবং সাহেরা ও খাতুনীকে তিন মাস করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
- খালাসপ্রাপ্ত ৪ জন: উজ্জ্বল, ওলি আহাদ, শুকুর জোলা ও রাজা জোলা।
মামলার রায় ঘোষণার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) এ এফ এম নুরতাজ আলম বাহার। তিনি জানান, দীর্ঘ শুনানি শেষে আদালত এই ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেছেন যা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।
