
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারে যুক্তরাষ্ট্র ঐতিহাসিকভাবে পরিচিত হলেও, এবার তাদের নিজস্ব মধ্যবর্তী নির্বাচন প্রভাবিত হয়েছে ইরানের সামরিক কৌশল ও যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাবে। নির্বাচন নয়, যেন ধর্মযুদ্ধে নেমেছেন রিপাবলিকানরা।
হরমুজ প্রণালি ঘিরে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর আগ্রাসী নীতির ফলে সৃষ্ট অস্থিরতা বিশ্ব অর্থনীতিতে যে বড় ধাক্কা দিয়েছিল, তার ঢেউ লেগেছে মার্কিন বাজারেও। ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর আগ্রাসনে কোণঠাসা ইরান যখন হরমুজ প্রণালি খামচে ধরল, তখনই যুদ্ধের আসল ধাক্কা খেল বিশ্ব অর্থনীতি এবং সেই সুনামি যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও আঘাত করল; যার পরিণতি আজকের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল। বলা বাহুল্য, গত কয়েক মাসের জরিপগুলোও এটাই জানাচ্ছিল। নিজেদের প্রেসিডেন্টের হাতে-পায়ে শিকল পরাতে চেয়েছেন তাঁরা এবং সেটা ভালোভাবেই হবে।
এই অর্থনৈতিক সংকটই এবারের নির্বাচনে ভোটারদের রায়ের পেছনে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।
গত ২০ বছরে খুব কমই এমন ঘটনা ঘটেছে, যেখানে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টির প্রেসিডেন্ট থাকা সত্ত্বেও সিনেট ও হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভে ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। ভোটারদের এই নজিরবিহীন অংশগ্রহণে আগাম ভোটের হারও ছিল অভাবনীয়, যা মূলত ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি তীব্র ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ। এমনকি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে অপহরণের মতো অপরাধের বিরুদ্ধেও রায় নয় এটা। শ্বেতাঙ্গ নিচুতলায় তাঁর প্রতি এভাবেই গত এক দশকের মোহ কেটে গেছে। রিপাবলিকান অনেক নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তোলা ও আটকানো যাবে। ডেমোক্রেটিক পার্টির অনেক সমর্থকের প্রত্যাশা, ডেমোক্র্যাটরা এ রকম বিচারক নিয়োগে বাধা হয়ে দাঁড়াবেন। এ ছাড়া সিনেটের অনেক কমিটি আছে, যারা অস্ত্র বেচাকেনায় সিদ্ধান্ত দেয়, রাষ্ট্রদূত নিয়োগে নজর রাখে।
নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, ভোটাররা ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যে রায় দিয়েছেন তা নীতিগত হওয়ার পাশাপাশি অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি। মূল্যস্ফীতি এবং কর্মসংস্থানের বেহাল দশায় সাধারণ মানুষ এতটাই হতাশ যে, তারা ক্ষমতার লাগাম টেনে ধরার পথ বেছে নিয়েছে। যদিও আমেরিকার নির্বাচনী সংস্কৃতিতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নীতিমালার চেয়ে অভ্যন্তরীণ জীবনযুদ্ধ গুরুত্ব পায়, তবে এবারের চিত্র ভিন্ন। ট্রাম্পের গত এক দশকের কর্মকাণ্ডকে তথাকথিত ‘ট্রাম্প-দশকের’ কফিনে পেরেক হিসেবে দেখছেন অনেকে, কারণ তিনি অভ্যন্তরীণ সামাজিক খাতের চেয়ে যুদ্ধ খাতে বেশি মনোযোগ দিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে অবহেলার শিকার করেছেন। কর্মসংস্থানের খারাপ অবস্থা এবং জিনিসপত্রের দাম বাড়া নিয়ে মানুষ হতাশ ও অসুখী ছিল। যদি প্রকৃতিই তাদের সংবিধানে লেখা গণতন্ত্রের মহান নীতিমালাকে ভোট দেওয়ার সময় তারা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিত, তাহলে ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে জিততেন না এবং এবারও রিপাবলিকানদের পরাজয় হতো আরও ব্যাপক। ২০১৬ সাল থেকে গত এক দশকে ট্রাম্প শাস্তিযোগ্য অনেক নীতিগত অপকর্ম করেছেন। ভোটাররা মনে করেছেন, ট্রাম্পের সিদ্ধান্তগুলো তাঁদের অর্থনৈতিক জীবনকে বিবেচনায় নিয়ে নেওয়া হয়নি। সাধারণ মানুষ তাতে অবহেলিত বোধ করেছে। শেষোক্ত কারণে এবারের নির্বাচনের অন্যতম আলোচিত যুদ্ধক্ষেত্র ছিল মিশিগান।
এই ফলাফলের ফলে সিনেট ও হাউসে ডেমোক্র্যাটদের অবস্থান শক্তিশালী হওয়ায় ট্রাম্পের সিদ্ধান্তগুলো প্রতিনিয়ত বাধার মুখে পড়বে। ডেমোক্র্যাটরা এখন ট্রাম্পের নিয়োগকৃত কর্মকর্তাদের কাজের তদন্ত করা, বিচারক নিয়োগের প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করা এবং অস্ত্র বিক্রিসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় কমিটির ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারবে। বিশেষ করে, ট্রাম্পের অভিবাসনবিরোধী নীতির সমর্থক রক্ষণশীল বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে এখন কড়া চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। বিশেষ করে বিচারক নিয়োগগুলো পাল্টানো জরুরি। ট্রাম্পের অভিবাসনবিরোধী নানান পদক্ষেপের সহযোগী রক্ষণশীল বিচারকেরা।
নির্বাচনের মাধ্যমে সামরিক লবির বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাটদের বিজয়ও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে। মিশিগানে আবদুল আল-সাইদের বিজয় ডেমোক্র্যাট দলের ভেতর ক্ষমতা ও চিন্তার মেরুকরণে নতুন মোড় এনেছে। স্বাস্থ্যনীতি ও ইসরায়েল ইস্যুতে তাঁর অবস্থান ট্রাম্পের আক্রমণাত্মক প্রচারণাকে পরাস্ত করেছে। এই ঘটনাটি ডেমোক্র্যাট শিবিরের অভ্যন্তরীণ শক্তিবৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়, যেখানে বার্নি স্যান্ডার্স বা ওকাসিও কর্টেজের মতো নেতাদের মতো প্রগতিশীলরা এখন বড় ধরনের প্রভাব ফেলছেন। ইতিমধ্যে এ–ও স্পষ্ট, নির্বাচনে সামরিক লবির বিরুদ্ধে সোচ্চার এবং ফিলিস্তিনিদের পক্ষে লড়া রাজনীতিবিদদের বড় অংশই জিতেছে। যাঁরা ডেমোক্র্যাট দলে প্রগতিশীল উপদল হিসেবে খ্যাত। এদের উত্থান ডেমোক্র্যাট দলে একটা মেরুকরণ ঘটাবে সামনের দিনগুলোতে, যা আবার বিশ্বরাজনীতিকে প্রভাবিত করবে।
জর্জিয়ার মতো সুইং স্টেটে আফ্রিকান-আমেরিকান ডেমোক্র্যাট কেইশা ল্যান্স বটমসের গভর্নর হিসেবে জয়ী হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী ইতিহাসে একটি বড় মাইলফলক। আটলান্টার প্রাক্তন মেয়র হিসেবে বাইডেন শিবিরের ঘনিষ্ঠ কেইশার এই বিজয় প্রমাণ করে যে, ডেমোক্র্যাটদের সব উপদলগুলো ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করেছে এবং তহবিল সংগ্রহেও অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে।
এই পরাজয় কেবল ট্রাম্পের জন্যই বিপর্যয়কর নয়, বরং এটি তাঁর নিজ দলের ভেতরেও তাঁকে কোণঠাসা করে ফেলবে। এখন রিপাবলিকান শিবিরে তাঁর বিরোধী যারা ছিলেন, তারা আরও সাহসী হয়ে উঠবেন। এছাড়া ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে ডানপন্থী রাজনীতির বিরুদ্ধে যে লড়াই চলছে, যুক্তরাষ্ট্রের এই ফলাফল সেখানে নতুন করে অক্সিজেন জোগাবে। তবে ট্রাম্প নিজের নীতিকৌশল থেকে সরে আসবেন—এমনটি ভাবার কোনো সুযোগ নেই, কারণ স্বৈরশাসকদের সংশোধন হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ দাবি করেছেন যে, মার্কিন জনগণ যুদ্ধের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে। ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সির শিরোনাম ছিল, ‘মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের মূল কারণ ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ।’ কানসাসে ১৯৩২ সালের পর এবারই প্রথম একজন ডেমোক্র্যাট সিনেটর নির্বাচিত হওয়ার ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, যুদ্ধ ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ কত গভীর। ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য এই ফলাফল একটি চূড়ান্ত সতর্কবার্তা হিসেবে গণ্য হচ্ছে। আবার মধ্যবর্তী নির্বাচনে সচরাচর এত বেশি ভোট পড়ে না—এবার আগাম ভোটে যা ঘটছিল।
