
দেশের তিন প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর—ঢাকার হযরত শাহজালাল, চট্টগ্রামের শাহ আমানত এবং সিলেটের ওসমানীকে ব্যবহার করে সোনা চোরাচালানের সক্রিয় নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। কখনো উড়োজাহাজের টয়লেট, আসন কিংবা কার্গো অংশে লুকিয়ে, আবার কখনো যাত্রীদের লাগেজ ও শরীরের ভেতরে করে আনা হচ্ছে বিপুল পরিমাণ সোনার চালান। শুল্ক বিভাগ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর অভিযানে বিভিন্ন সময়ে এসব চালান ও বাহকেরা ধরা পড়লেও এর নেপথ্যে থাকা মূল নির্দেশাতা, অর্থ জোগানদার ও দেশীয় গ্রাহকেরা বরাবরই অধরা থেকে যাচ্ছেন। কাস্টমস ও গোয়েন্দা সংস্থার অভিযানে চালান ধরা পড়লেও এসবের নেপথ্যে থাকা মূল পরিকল্পনাকারী, অর্থদাতা ও নির্ধারিত গ্রহীতাদের শনাক্ত করা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তদন্তসংশ্লিষ্টদের খতিয়ে দেখতে হবে, চালানগুলো কোথা থেকে আসছে, কার নির্দেশে বহন করা হচ্ছে এবং গন্তব্যে পৌঁছানোর পর কার কাছে হস্তান্তরের কথা ছিল।
সাম্প্রতিক বেশ কিছু অভিযানে বিমানবন্দরে সোনা পাচারের চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। গত ২৫ অক্টোবর চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে জেদ্দা থেকে আসা এক যাত্রীর কাছ থেকে প্রায় আড়াই কেজি সোনার চুড়ি জব্দ করা হয়, যার করসহ আনুমানিক মূল্য ২ কোটি ৮০ লাখ টাকা। তার কিছুদিন আগে ঢাকা বিমানবন্দরে মালদ্বীপ ফেরত দুই যাত্রীর পেটের ভেতর থেকে উদ্ধার হয় ৪ কোটি টাকা মূল্যের ২ কেজি ৭৩৪ গ্রাম সোনার পেস্ট। কেবল যাত্রীরাই নন, পাচারে জড়িয়ে পড়ছেন বিমানকর্মীরাও। গত ৪ অক্টোবর এমিরেটস এয়ারলাইন্সের দুই কর্মীর জুতা থেকে উদ্ধার করা হয় ১৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা মূল্যের ৯.৩৪ কেজি সোনার বার।
এছাড়া উড়োজাহাজের ভেতরে পরিত্যক্ত অবস্থায় সোনা উদ্ধারের ঘটনাও প্রতিনিয়ত ঘটছে। গত ২১ সেপ্টেম্বর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটের শৌচাগার থেকে ৫.৮৩২ কেজি সোনা উদ্ধার করা হয়। এর আগে ফ্লাইদুবাইয়ের উড়োজাহাজের আসনের নিচ থেকে ৯.৩৩ কেজি এবং জুলাই মাসে বিমানের কার্গো হোল্ড থেকে ১৮ কেজির বেশি সোনা জব্দ করেন কর্মকর্তারা। প্রতিনিয়ত এসব চালান আটকের ঘটনায় বিমানবন্দরের ভেতরে কর্মরত কোনো কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠছে। তবে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সে জন্য সিসিটিভি ফুটেজ, ডিউটি রোস্টার ও আর্থিক লেনদেন সূক্ষ্মভাবে অনুসন্ধানের তাগিদ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে তদন্ত ও প্রমাণ ছাড়া কাউকে দায়ী করা যায় না।
চোরাচালান প্রতিরোধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়ে ঢাকা কাস্টম হাউসের কমিশনার মো. রইচ উদ্দিন খান বলেন, বিমানবন্দরে নজরদারি ব্যবস্থা অনেক বৃদ্ধি করা হয়েছে এবং শুল্ক কর্মকর্তাদের সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল বাহক গ্রেফতার বা সোনা জব্দ করে এই চক্র থামানো সম্ভব নয়। পাচারের পুরো সরবরাহ ব্যবস্থা ভাঙতে হলে আন্তর্জাতিক সমন্বয়, মূল মূলধনের উৎস চিহ্নিতকরণ এবং সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের বিচারে মুখোমুখি করতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সোনা উদ্ধার ও বাহক গ্রেপ্তার করলেই চোরাচালান বন্ধ হবে না।
