
রাজধানীর অফিসার্স ক্লাবের নির্মাণাধীন ভবনের ভেতরে পড়ে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো. মোশাররফ হোসেন।
দীর্ঘ ১৫ বছর আগে স্ত্রী মারা যাওয়ার পর দুই মেয়েকে নিয়েই ছিল তাঁর সংসার। সেই বাবাই ছিলেন ২৮ বছর বয়সী তাসমিয়ার একমাত্র অবলম্বন।
বড় মেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত থাকলেও ছোট মেয়ে তাসমিয়া মারজান শবনমের সঙ্গে রাজধানীর বনানীর বাসায় থাকতেন তিনি। শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে চোখে কম দেখতেন মোশাররফ হোসেন। এমন পরিস্থিতিতে বাবার আকস্মিক প্রয়াণে দিশাহারা অবস্থায় রয়েছেন তাঁর ছোট মেয়ে তাসমিয়া। তাসমিয়া মারজান বলেন, আগামীকাল সোমবার তাঁর বাবাকে মুন্সিগঞ্জের গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হবে। এরপর দুই মেয়েকে নিয়ে তিনি রাজধানীর বনানীর ৫ নম্বর সড়কের একটি ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকতেন। তিনি বলেন, এ মৃত্যু নিয়ে তাঁদের কোনো সন্দেহ নেই। একদিকে বাবাকে হারানোর শোক, অন্যদিকে জীবনের এই কঠিন সময়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে দিশাহারা তাসমিয়া।
ঘটনাটি ঘটে গত শুক্রবার সকালের দিকে। সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পর্যালোচনা করে রমনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইয়াছিন মিয়া জানান, মোশাররফ হোসেনকে ক্লাবের ভেতরে বারবার ওপর-নিচ করতে দেখা গিয়েছিল, সম্ভবত তিনি পথ খুঁজে পাচ্ছিলেন না। একপর্যায়ে তিনি ভবনের বেজমেন্ট-১-এর লিফটের ফাঁকা জায়গা দিয়ে নিচে পড়ে যান। এরপর সকাল সোয়া ১১টার দিকে তাঁকে নির্মাণাধীন ভবনের নিচতলায় সিঁড়ির পাশে রক্তাক্ত ও অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, শুক্রবার সকাল ১০টার দিকে মেয়ে তাসমিয়াকে সাঁতার শেখানোর উদ্দেশ্যে অফিসার্স ক্লাবে নিয়ে গিয়েছিলেন মোশাররফ হোসেন। মেয়েকে সুইমিংপুলের পাশে রেখে তিনি নির্মাণাধীন ভবনের ভেতর যান। সেখান থেকে উদ্ধারের পর তাঁকে দ্রুত শাহবাগের বারডেম হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে দিবাগত রাত পৌনে ১২টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়, সেখানে চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
নিহতের ভগ্নিপতি জাকির হোসেন জানিয়েছেন, অফিসার্স ক্লাবের সদস্য ছিলেন মোশাররফ হোসেন। মৃত্যুর ঘটনায় পরিবারের কোনো অভিযোগ না থাকায় পুলিশের অনুমতি সাপেক্ষে ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহ হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। তাঁর ভাইয়ের করা অপমৃত্যুর মামলার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় রমনা থানায় অপমৃত্যুর মামলা করেছেন তাঁর ভাই মোতাহার হোসেন।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত বড় মেয়ে সারিকা আজমিরকে বাবার মৃত্যুর খবর জানানো হয়েছে। সোমবার তাঁর দেশে ফেরার কথা রয়েছে। পরিবারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার পশ্চিম দেওভোগ গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে সাবেক এই অতিরিক্ত সচিবকে দাফন করা হবে।
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাস্থলের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির পাশাপাশি যাবতীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে বিষয়টিকে দুর্ভাগ্যজনক দুর্ঘটনা হিসেবেই দেখছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বাবার মৃত্যুতে ভেঙে পড়া তাসমিয়াকে কোনো সান্ত্বনাই যেন স্বস্তি দিতে পারছে না, এখন কেবল শেষ বিদায়ের প্রস্তুতি চলছে। স্বজনদের সান্ত্বনাও থামাতে পারছে না তাঁর কান্না। প্রাথমিক তদন্তে ঘটনাটি দুর্ঘটনাজনিত বলে মনে হচ্ছে।
