
নিজস্ব প্রতিনিধি:
মতলব দক্ষিণে দিন দিন বেড়েই চলেছে কিশোর গ্যাং-এর উৎপাত। উপজেলার বিভিন্ন স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসার কিশোরদের রয়েছে বিভিন্ন গ্রুপ। যাদের কারণে প্রতিনিয়ত ইভটিজিং এর শিকার হচ্ছে ছাত্রীরা। তাদের উৎপাতে অনেক ছাত্রী পড়াশোনা ছাড়তেও বাধ্য হচ্ছে। শুধু ইভটিজিং নয় ধর্ষণ, চুরি, ছিনতাই, হত্যাকান্ড, মাদক-সেবনসহ নানা ধরণের অপরাধমূলক কর্মকান্ড জড়িয়ে পড়তেছে উঠতি বয়সী এইসব কিশোররা।
দেখা যায়, প্রতিনিয়তে মরণনেশা ইয়াবা-ফেন্সিডিল, গাঁজার মত মরণ নেশায় আসক্ত হচ্ছে। মাদকের টাকা জোগাড় করতে তারা চুরি-ছিনতাই শুরু করেছে।
তুচ্ছ বিষয় নিয়ে কথা কাটাকাটি করে মতলব দক্ষিণের ঘোষপাড়া এলাকায় মতলব জে.বি পাইলট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে সম্প্রতি ছুড়িকাঘাত করে রক্তাক্ত জখম করে তার এক সহপাঠী। গুরুতর আহত অবস্থায় স্থানীয়রা মতলব দক্ষিণ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চাঁদপুর সদর হাসপাতালে প্রেরণ করে। বর্তমানে সে সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
সমাজ বিজ্ঞানীরা মনে করেন, কিশোররা মূলত গ্যাংস্টার হয়, টাকা আর ক্ষমতার মোহে। বর্তমানে কিশোর গ্যাং ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে।
যে কোনো ধরনের অপরাধ করতে তারা মোটেই দ্বিধাবোধ করে না। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক ছত্র-ছায়ায় তারা ভয়ঙ্কর অপরাধী হয়ে ওঠে।
কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা একটি নির্দিষ্ট এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে এবং সর্বদা আধিপত্য ধরে রাখার চেষ্টা করে। তারা গ্যাং সংগঠন নিয়ে গর্ববোধ করে এবং গ্যাং সদস্য হিসেবে তৃপ্তি অনুভব করে। ক্ষেত্রবিশেষে গ্যাংয়ের সদস্যদের মাঝে একই ধরনের জামাকাপড় পরার স্টাইল দেখা যায়। আবার কেউ কেউ জুয়েলারি ও অলঙ্কার পরে থাকে।
তাছাড়া, আধিপত্য বিস্তারের জন্য তারা অস্ত্র যেমন-ছুরি, রামদা, হকিস্টিক ইত্যাদি সংগ্রহে রাখে। কিশোররা এলাকার অলিগলি, পাড়া-মহল্লায় বিভিন্ন নামে গড়ে তুলে বিভিন্ন গ্রুপ। তাদের দ্বারা প্রতিনিয়ত সংঘটিত হচ্ছে নানা অপরাধ।
স্কুল ফাঁকি দিয়ে বিভিন্ন জায়গায় আড্ডা দেয়া, স্কুলের সামনে ইভটিজিং করা, সন্ধ্যার পর উচ্ছৃঙ্খল আড্ডায় আর নেশায় মেতে ওঠা, আবাসিক এলাকায় হৈ-হুল্লোড় করা, মুরব্বিদের সঙ্গে বেয়াদবি করা যেন তাদের নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কিশোর অপরাধ বেড়ে যাওয়ায় চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে সুধীমহলে। বর্তমানে অ্যাপভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কারণে কিশোর অপরাধের প্রবণতা অনেক বেড়েছে। এছাড়া, গ্যাং সদস্যরা বিভিন্ন পার্ক, খোলা জায়গায়, ফুটপাতে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনে একত্রিত হয়ে ভিডিও কনটেন্ট তৈরির নামে অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি, ইভটিজিং, পথচারীদের গতিরোধ, বাইক মহড়াসহ বিভিন্ন অসৌজন্যমূলক আচরণ করে থাকে।
কিশোর গ্যাং সদস্যদের অধিকাংশের বয়স ১২ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে হয়ে থাকে। ২০১৭ সালে উত্তরায় আদনান হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে মূলত কিশোর গ্যাংয়ের নির্মমতা জনসমক্ষে উন্মোচিত হয়। গত ১ বছরে ঢাকায় অন্তত পাঁচটি হত্যাকাণ্ডের পেছনে রয়েছে কিশোর গ্যাং নামক চক্র। এক জরিপে জানা গেছে, গত ১৭ বছরে ঢাকায় কিশোর অপরাধীদের হাতে ১২০ জন খুন হয়েছে। এর মধ্যে শুধুমাত্র গত ২ বছরে খুন হয়েছে ৩৪ জন।
কিশোর অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। সমাজব্যবস্থা, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সাহচর্য, ব্যক্তিত্ব ইত্যাদি ক্ষেত্রের নানাবিধ উপকরণ গ্যাং তৈরির মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। অন্যদিকে, কিশোরদের রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার কারণে তাদের মধ্যে এক ধরনের গ্যাং কালচার গড়ে উঠছে। অনেক সময় ভিনদেশি সংস্কৃতির প্রভাব তাদেরকে অপরাধ জগতে নিয়ে আসছে।
তাছাড়া, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, সংস্কৃতি চর্চার অপ্রতুলতা, অসুস্থ বিনোদন, অভিভাবকদের উদাসীনতা, নিয়ন্ত্রণহীনতা ও কিশোরদের রাজনৈতিক কাজে ব্যবহারের কারণে দেশে কিশোর অপরাধ জ্যামিতিক হারে বাড়ছে।
পারিবারিক বিশৃঙ্খলা ও পিতামাতার মধ্যে বিবাহ-বিচ্ছেদের কারণেও অনেক সময় কিশোররা অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। তাছাড়া, পরিবারের কেউ গ্যাং সদস্য হলে কিশোররাও এ পথে আসতে উৎসাহিত হয়।
কিশোর গ্যাং রোধ করতে হলে তাই প্রশাসনের পাশাপাশি সচেতন মহলকে এগিয়ে আসতে হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
