
হরমুজ ও বাব আল–মানদেব প্রণালিকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থাকে মারাত্মক হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। হরমুজ ও বাব আল–মানদেব প্রণালিকে ঘিরে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বিশ্বজ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। ইরানের ‘এশীয় বন্ধুরা’ কি হরমুজ প্রণালি খুলতে পারবে। হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা, ইরানের পাল্টা পদক্ষেপের হুমকি ও লোহিত সাগরে হুতিদের হামলা এবং বাব আল–মানদেব প্রণালিতে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। হরমুজের পর এবার বাব আল-মানদেব: জ্বালানি নিরাপত্তার ঝুঁকি কীভাবে কাটবে। হরমুজ প্রণালি না খুললে বিশ্বে দুর্ভিক্ষ কেন আসন্ন।
গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথগুলোয় অচলাবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে তেলের দাম ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি সাপ্লাই চেইন মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। রিয়াদের বার্তা: প্রতিরোধের পাশাপাশি নমনীয়তা।
সত্তর দশকের তেল নিষেধাজ্ঞার পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি ব্যবস্থা এবার এক কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছে। এই সংকটের গভীরতা বুঝতে আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যানের দিকে তাকানো জরুরি।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশের জন্য এই সংকট কেবল জ্বালানি আমদানির খরচ বৃদ্ধির কারণ নয়; এটি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও সরাসরি অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে। এ বাস্তবতায় বাংলাদেশের নিজস্ব জ্বালানি সম্পদের অনুসন্ধান, আমদানিনির্ভরতা হ্রাস, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ ও সৌদি আরবের সঙ্গে কৌশলগত সহযোগিতা জোরদার করাই হতে পারে ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কার্যকর পথ। এ ক্ষেত্রে সব পক্ষের সহযোগিতামূলক ভূমিকা থাকতে হবে। পাইপলাইনটির কার্যকর পরিবহনক্ষমতা ও বাস্তবে ব্যবহারের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে এর মাধ্যমে কতটা সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব। এগুলোতে পিছিয়ে থাকলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ঝুঁকে পড়বে। তবে এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে অর্থায়নের উৎস, শর্ত, বাস্তবায়ন কাঠামো ও অর্থ ছাড়ের ওপর। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা কাটানো, শিল্পের জ্বালানি চাহিদা পূরণ ও বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে এ ধরনের পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অনুসন্ধানের ফলাফল, নতুন কূপের উৎপাদন ও বিনিয়োগ বাস্তবায়নের অগ্রগতিই শেষ পর্যন্ত এ উদ্যোগের সাফল্য নির্ধারণ করবে। তবে কূটনৈতিক অবস্থানের পাশাপাশি বিকল্প সরবরাহব্যবস্থা, আঞ্চলিক সহযোগিতা ও জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য নিশ্চিত করাও জরুরি। বাংলাদেশের জন্য সৌদি আরবের সঙ্গে সহযোগিতার সম্ভাবনা শুধু অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি আমদানিতে সীমাবদ্ধ নয়। সৌদি জ্বালানিমন্ত্রীর ‘ধীর ও বিবেচিত রূপান্তর’ দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশের জন্য এমন একটি পরিকল্পনা প্রয়োজন, যেখানে জ্বালানি নিরাপত্তা, সাশ্রয়ী সরবরাহ ও পরিবেশগত স্থায়িত্বকে একসঙ্গে গুরুত্ব দেওয়া হবে। তবে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর শুধু লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের বিষয় নয়; এর জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত নীতিমালা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, আধুনিক সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থা, জ্বালানি সংরক্ষণ প্রযুক্তি ও বাস্তবায়নযোগ্য প্রকল্প। ইরান যুদ্ধে বাংলাদেশের জ্বালানি ও রিজার্ভ কতটা চাপে।
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি দেশের ভেতর মুদ্রাস্ফীতি উসকে দেওয়ার পাশাপাশি সার্বিক উন্নয়নযাত্রাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। হরমুজ কেন বিশ্বব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির অভিঘাত সামাল দিতে আন্তর্জাতিক অংশীদার ও এজেডইসি প্লাস জোটের সঙ্গে দুই বিলিয়ন ডলারের জরুরি তহবিল গঠনের উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি নিরাপত্তা এখন কেবল বাণিজ্যিক বিষয় নয়, বরং এটি জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
হরমুজ ও বাব আল-মানদেব প্রণালির বৈশ্বিক গুরুত্ব
- হরমুজ প্রণালির ব্যবহার: মার্কিন এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ইআইএ) ও এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের দৈনিক তেল ব্যবহারের প্রায় ২০ শতাংশ অর্থাৎ ২০ দশমিক ৫ মিলিয়ন ব্যারেল তেল এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়।
- এলএনজির নির্ভরতা: একই সঙ্গে বৈশ্বিক তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের বা এলএনজির একটি বিরাট অংশও এই সামুদ্রিক পথটির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল।
- বাব আল-মানদেবের ভূমিকা: অন্যদিকে বাব আল–মানদেব প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৮ দশমিক ৮ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পরিবাহিত হয়, যা মূলত ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বাজারে জ্বালানি সরবরাহে প্রধান ভূমিকা রাখে।
- দ্বিমুখী সংকট: এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে একযোগে অচলাবস্থা তৈরি হলে তা বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে মারাত্মক দ্বিমুখী সংকটের জন্ম দেবে।
এই অনিশ্চয়তা ও উত্তেজনার মাঝে রিয়াদ ও ঢাকা থেকে আসা নীতিগত বার্তাগুলো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
সৌদি আরব বিকল্প তেল পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে সংকটের মধ্যেও স্থিতিস্থাপকতা বজায় রাখার কার্যকর দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। জ্বালানিব্যবস্থাকে ফিনিক্স পাখির সঙ্গে তুলনা করে তিনি যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেই বক্তব্যের মূল তাৎপর্য হলো, সংকটের মধ্যেও ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।
দেশটির পূর্ব–পশ্চিম পাইপলাইন ব্যবস্থার মতো বিকল্প অবকাঠামো আন্তর্জাতিক বাজারে আস্থার পরিবেশ বজায় রাখতে সাহায্য করে।
ঢাকার কৌশল ও জ্বালানি নিরাপত্তা
- তিনটি স্তম্ভের কৌশল: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকারের সামগ্রিক জ্বালানি কৌশল মূলত তিনটি প্রধান স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
- আর্থিক সুরক্ষা তহবিল: আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির ধাক্কা সামাল দিতে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের নিয়ে একটি বিশেষ তহবিল গঠনের রূপরেখা রয়েছে।
- দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা: ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছানোর লক্ষ্য সামনে রেখে ১০ বছর মেয়াদি বিশেষ জ্বালানি কৌশল প্রণয়ন করা হয়েছে।
- দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান: আমদানিনির্ভরতা উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
রিয়াদে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক জ্বালানি ফোরামে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত যে রূপরেখা তুলে ধরেছেন, তাতে আমদানিনির্ভরতা হ্রাসের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
এর অংশ হিসেবে কামতা–২সহ তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে চারটি নতুন কূপে একযোগে খননকাজ শুরু হয়েছে। এ লক্ষ্যে কামতা–২–সহ তিতাসে চারটি নতুন কূপে একযোগে খনন শুরু হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই উদ্যোগগুলোর সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে আগামী জুনের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক অতিরিক্ত ৫৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হওয়ার জোরালো প্রত্যাশা রয়েছে।
সৌদি সহযোগিতা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি
- পেট্রোলিয়াম কংগ্রেসে বার্তা: সম্প্রতি রিয়াদে অনুষ্ঠিত ২৫তম ওয়ার্ল্ড পেট্রোলিয়াম কংগ্রেসে সৌদি জ্বালানিমন্ত্রী প্রিন্স আবদুল আজিজ বিন সালমান জ্বালানিব্যবস্থার সংকট উত্তরণের উপায় নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দেন।
- সবুজ জ্বালানি লক্ষ্য: ২০৩০ সালের মধ্যে মোট জ্বালানির ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
- বিনিয়োগ আকর্ষণ: আকওয়া পাওয়ারসহ আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিভিন্ন বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানকে সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ খাতে আকৃষ্ট করার নানামুখী উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
- সমন্বিত পদক্ষেপ: জ্বালানি রূপান্তরের এই ক্রান্তিলগ্নে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান অব্যাহত রাখার পাশাপাশি বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী ব্যবস্থাপনা ও অপচয় রোধের ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।
