
১৯৭১ সাল। বিশ্বজুড়ে তখন চলছে হানাহানি আর অস্থিরতা। রক অ্যান্ড রোলের সেই উত্তাল সময়ে জন লেননের কণ্ঠে শোনা গেল এক সাদাসিধে কিন্তু গভীর অর্থবহ সুর—’ইমাজিন’। কোনো জটিলতা ছাড়াই শান্তির বার্তা নিয়ে আসা এই গানটি যেন মুহূর্তেই পুরো বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। জন লেননের জন্মদিনে আজও বিশ্বজুড়ে সেই গানের আবেদন এতটুকু ম্লান হয়নি। পঞ্চাশ বছর পার করেও গানটি আমাদের মনে প্রশ্ন জাগায়, আমরা কি আজও লেননের সেই সাম্যের পৃথিবী গড়তে পেরেছি? ৫০ বছর আগে লেখা সেই গানের প্রাসঙ্গিকতা কি আজকের দুনিয়ায় কোনো অংশে কম। রক অ্যান্ড রোলসের সেই ঝাঁকানাকা যুগে আড়ম্বরহীন সাদাসিধে এ গানই কথার জোরে কাঁপিয়ে দিল পুরো বিশ্বকে। আজ জন লেননের জন্মদিনে তাঁকে নিয়ে থাকল এই আয়োজন। জাহাজঘাটের ছেলেটি জীবনকে ছুড়ে দিল গানে।
লিভারপুলের সাধারণ এক কিশোর থেকে বিশ্বসংগীতের কিংবদন্তি হয়ে ওঠার গল্প লেননের। ষাটের দশকের জনপ্রিয় ব্যান্ড ‘বিটলস’-এর অন্যতম প্রধান সদস্য হিসেবে সংগীতজগতে নিজের জায়গা করে নিয়েছিলেন তিনি। প্রায় এক দশক বিটলসের সঙ্গে পথ চলার পর একক ক্যারিয়ার শুরু করেন। এই সময় তাঁর ছায়াসঙ্গী ছিলেন স্ত্রী ইয়োকো ওনো। যুদ্ধবিধ্বস্ত সেই সময়ে লেনন চেয়েছিলেন এমন এক পৃথিবী, যেখানে সীমানা নেই, নেই কোনো বিভেদ, ধর্ম বা যুদ্ধের উন্মাদনা। এই স্বপ্নেরই প্রতিফলন ঘটেছিল তাঁর ‘ইমাজিন’ গানে। ষাটের দশকে সংগীতজগৎকে মাতিয়ে তোলা চার তরুণ তুর্কির একজন লেনন।
গানটির সৃষ্টির পেছনে ছিল এক অদ্ভুত সময়। বিটলস ভেঙে যাওয়ার ঠিক সেই সন্ধিক্ষণে ইয়োকো ওনোর জন্মদিনে উপহার দেওয়া সাদা পিয়ানোতে লেনন সুর করেছিলেন এই গান। লেনন নিজেই জানিয়েছিলেন, গানটির মূল অনুপ্রেরণা ছিল ইয়োকো ওনোর লেখা বই ‘গ্রেপফ্রুট’। সেই বইয়ের পাতায় পাতায় লেখা ছিল, ‘ইমাজিন দিস, ইমাজিন দ্যাট’। ইয়োকোর ভাষায়, শিল্পী হিসেবে তাঁরা দুজন মিলে বিশ্বের ভিন্ন ভিন্ন প্রান্তের দর্শনকে এক করেছিলেন। ১৯৬৯ সালে ভিয়েতনাম যুদ্ধ নিয়ে প্রতিবাদী গান ‘গিভ পিস আ চান্স’ লিখেছিলেন লেনন, আর তারই ধারাবাহিকতায় একাত্তরে জন্ম নেয় বিশ্বশান্তির এই কালজয়ী সংগীত। বইটির মধ্যে অনেকগুলো জায়গায়ই এটা বলা ছিল, “ইমাজিন দিস, ইমাজিন দ্যাট”। ১৯৬৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র–ভিয়েতনাম যুদ্ধ নিয়ে লিখলেন ‘গিভ পিস আ চান্স’ (শান্তিকে দাও একটা সুযোগ)। গানের কথা ও ধারণায় ওনোর কাছে প্রচণ্ড ঋণী লেনন।
শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে লেনন ও ওনোর প্রতিবাদ ছিল অভিনব। তাঁরা নিজের শোবার ঘরে ভক্তদের আমন্ত্রণ জানিয়ে শুরু করেছিলেন ‘বেড-ইন ফর পিস’ কর্মসূচি। যুদ্ধের বিরুদ্ধে এটি ছিল তাঁদের নীরব কিন্তু জোরালো প্রতিবাদ। ‘ইমাজিন’-এর আবেদন কেবল সাধারণ শ্রোতাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। জোয়ান বায়েজ থেকে শুরু করে ২০০৫ সালে ম্যাডোনার মতো বিশ্বখ্যাত শিল্পীরাও সুনামিতে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় গেয়েছেন এই গান। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের মতে, বিশ্বের অনেক দেশেই জাতীয় সংগীতের পাশাপাশি মানুষ এই গানটিকে শান্তির মর্যাদা দিয়েছে।
তবে ব্যক্তিগত জীবনে এই মহান শিল্পী খুব বেশি সময় পাননি। ১৯৮০ সালের ৮ ডিসেম্বর নিজেরই এক ভক্ত মার্ক ডেভিড চ্যাপম্যানের গুলিতে প্রাণ হারান জন লেনন। আজীবন যুদ্ধহীন পৃথিবীর স্বপ্ন দেখা এই শিল্পী পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেও, তাঁর শান্তির বার্তা আজও ছড়িয়ে আছে প্রতিটি প্রান্তরে।
