
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে উচ্চমূল্যস্ফীতি নিয়ে ভোটারদের তীব্র অসন্তোষের সুবিধা পেয়ে ভূমিধস জয় পেয়েছে ডেমোক্রেটিক পার্টি। তবে এই বড় সাফল্যের পরই দলটির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ও সংসারের খরচ কমিয়ে আনা। যে উচ্চমূল্যস্ফীতি রিপাবলিকানদের নির্বাচনী বিপর্যয়ের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে, এখন সেই একই সমস্যার সমাধান করার চাপ ডেমোক্রেটদের ওপর। আমেরিকানরা নিত্যপণ্যের দাম কমার অপেক্ষায় থাকলেও তা দ্রুত বাস্তবায়ন করা নীতিনির্ধারকদের জন্য বেশ কঠিন।
সুস্থ অর্থনীতির স্বার্থে খাদ্য ও জ্বালানির দাম কিছুটা কমলেও, আগের কয়েক বছরের মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা পুষিয়ে সব পণ্যের দাম ২০১৯ সালের পর্যায়ে ফিরিয়ে নেওয়া কার্যত অসম্ভব। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পণ্যের দাম অস্বাভাবিক দ্রুত কমিয়ে আনলে কর্মসংস্থান ও আয় কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়, যা সাধারণ পরিবারগুলোকে আরও বড় সংকটে ফেলতে পারে। নতুন ডেমোক্রেট-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস এবং অঙ্গরাজ্যগুলোর আইনসভায় দলটির প্রতিনিধিদের জন্য এটি হবে প্রথম বড় পরীক্ষা। ভোটারদের পারিবারিক বাজেটে বাস্তব পরিবর্তন আনার মতো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি। এ ধরনের ব্যাপক মূল্যপতন ঘটলে কর্মসংস্থান কমে যেতে পারে, মানুষের আয়ও হ্রাস পেতে পারে। ফলে যে স্বস্তি দেয়ার চেষ্টা, শেষ পর্যন্ত তাতে পরিবারগুলো আগের চেয়েও খারাপ অবস্থায় পড়তে পারে।
সেন্টার অন বাজেট অ্যান্ড পলিসি প্রায়োরিটিজের ফেডারেল বাজেট নীতির জ্যেষ্ঠ পরিচালক ব্রেন্ডান ডিউক অ্যাক্সিওসকে জানান, যদিও দাম ২০১৯ সালের পর্যায়ে নেওয়া সম্ভব নয়, তবে নীতিগত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে অনেক মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা কিছুটা কমানো যেতে পারে। তার মতে, স্বাস্থ্যবিমায় ভর্তুকি পুনর্বহাল, খাদ্য সহায়তা কর্মসূচিতে কাটছাঁট প্রত্যাহার এবং ইরান যুদ্ধের অবসানের মতো পদক্ষেপ মানুষের ব্যয় কমাতে সাহায্য করতে পারে। তবে এক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে রয়েছে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থন পাওয়ার অনিশ্চয়তা। ডিউকের আশঙ্কা, এআই খাতের বুদ্বুদ ফেটে যাওয়া কিংবা বেকারত্ব বাড়ার মতো অর্থনৈতিক অস্থিরতা মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সংকটকে ঢাকা দিলেও আদতে সমস্যার সমাধান হবে না।
বড় জয়ের পরও পারিবারিক ব্যয় কমানোর ক্ষেত্রে ডেমোক্রেটদের ক্ষমতা সীমিত। নির্বাচনী বাজারের প্রত্যাশায় তেলের দাম কিছুটা কমলেও জ্বালানির বাজারে দীর্ঘমেয়াদী স্বস্তি অনেকটা নির্ভর করছে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের ওপর। এছাড়া কংগ্রেস শুল্ক প্রত্যাহারের পক্ষে ভোট দিলেও ট্রাম্প তা ভেটো দিয়ে আটকে দিতে পারেন। আবার আমদানি ব্যয় কমলেও ব্যবসায়ীরা সেই সুবিধা ভোক্তাদের দেবেন কি না, তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। একইসাথে স্বাস্থ্যবিমা আইন বা মেডিকেইডে কাটছাঁট প্রত্যাহারের মতো উদ্যোগও অভ্যন্তরীণ বিরোধ বা প্রেসিডেন্টের বাধার মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তা ছাড়া ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো ব্যয় কমার পুরো সুবিধা ভোক্তাদের দেবে—এমন নিশ্চয়তাও নেই। কিন্তু গত এক দশকের অভিজ্ঞতা বলছে, এমন নিশ্চয়তা দেয়া কঠিন।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, অনেক নবনির্বাচিত ডেমোক্রেট প্রার্থী নিত্যপণ্য ও জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার কথা বলেছেন। যেমন, টেক্সাসের জেমস তালারিকো শুল্ক প্রত্যাহার ও বাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। নর্থ ক্যারোলাইনার রয় কুপার দাম কমানোর অঙ্গীকার করেছেন, আবার সাউথ ক্যারোলাইনার অ্যানি অ্যান্ড্রুজ ফেডারেল গ্যাস কর সাময়িকভাবে স্থগিত করার প্রস্তাব দিয়েছেন। অঙ্গরাজ্য পর্যায়ে টেক্সাসের নবনির্বাচিত গভর্নর জিনা হিনোজোসা ১ হাজার ৫০০ ডলারের রিবেট বা অর্থ ফেরত দেওয়ার চেক প্রদানের প্রস্তাব রেখেছেন, যা সরাসরি ভোটারদের স্বস্তি দেওয়ার একটি প্রয়াস। তাদের কেউ কেউ খাদ্যপণ্য ও জ্বালানির মূল্য নিয়ন্ত্রণে নির্দিষ্ট পরিকল্পনার কথাও বলেছেন।
তবে এসব উদ্যোগ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকরা। ধনকুবের বিনিয়োগকারী এবং ডাবললাইন ক্যাপিটালের প্রধান নির্বাহী জেফ গান্ডলাখ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন, ডেমোক্রেটদের সামনে এখন ‘সাশ্রয়ী জীবনযাপন’ নিশ্চিত করাই মূল দায়িত্ব। তিনি সতর্ক করে বলেন, দ্রুত দাম কমাতে কোনো জাদুর কাঠি নেই; হয়তো মানুষকে সরাসরি অর্থ দিয়ে উচ্চমূল্যকে সামাল দিতে হবে, যা আখেরে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।
সব মিলিয়ে ক্রয়ক্ষমতা পুনরুদ্ধারে পণ্যের দাম কমানোর চেয়ে দীর্ঘমেয়াদে মূল্যস্ফীতির চেয়ে দ্রুত মজুরি বৃদ্ধির হার বাড়ানো বেশি কার্যকর হতে পারে, তবে এটি অত্যন্ত ধীর প্রক্রিয়া। বর্তমানে ডেমোক্রেটরা কংগ্রেসে বড় সাফল্য পেলেও নির্বাহী বিভাগে তাদের নিয়ন্ত্রণ নেই, তাই প্রেসিডেন্টের ভেটো ঠেকানোর মতো শক্তিও তাদের হাতে নেই। তবুও ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ও নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রক্ষার স্বার্থে ভোটারদের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া এখন ডেমোক্রেটদের জন্য অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। তবু ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হোয়াইট হাউসে ফেরার এবং কংগ্রেসে নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখার লক্ষ্য সামনে রেখে ডেমোক্রেটদের জন্য এখনই মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। এর পাশাপাশি নতুন করে মূল্যস্ফীতির ধাক্কা না আসার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
