
সময় পরিবর্তনের সাথে সাথে বদলে যায় ফুটবল তারকাদের জীবন।
একসময়ের সান্তিয়াগো বার্নাব্যুর যেসব তারকা খেলোয়াড় মাঠ কাঁপাতেন, তাঁদের কেউ এখন কোচিং পেশায়, কেউ ফুটবল প্রশাসনের নীতিনির্ধারক, আবার কেউ বা ফুটবলকে পেছনে ফেলে সমুদ্রে মাছ ধরে জীবন কাটাচ্ছেন। মদরিচ যেন ফুটবলকে বোঝাচ্ছেন, বয়স কেবল ক্যালেন্ডারের হিসাব।
বিপরীতে কয়েকজন এখনও বয়সকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে পেশাদার ফুটবল খেলে যাচ্ছেন। পর্তুগিজ মাস্টারমাইন্ড জোসে মরিনিওর ক্যারিয়ারে একাধিক ক্লাবের অভিজ্ঞতা থাকলেও ২০১৩ সালের মার্চে রিয়াল মাদ্রিদের ডাগআউটে বসে শেষবারের মতো বার্সেলোনার মুখোমুখি হয়েছিলেন তিনি। সেই ঐতিহাসিক ম্যাচে করিম বেনজেমা ও সের্হিও রামোসের গোলে ২-১ ব্যবধানে জয় পেয়েছিল রিয়াল। বার্সার পক্ষে একটি গোল শোধ করেছিলেন লিওনেল মেসি। দীর্ঘ ১৩ বছর পর আবারও এল ক্লাসিকোর আবহে আলোচনার কেন্দ্রে সেই ম্যাচে খেলা রিয়ালের একাদশের ১১ জন ফুটবলারের বর্তমান অবস্থান। এল ক্লাসিকোর ফল ঠিক করে দিতে পারে যে পাঁচ প্রশ্নের উত্তর। মাদ্রিদের ক্লাব রায়ো ভায়েকানোয় এক মৌসুম কাটিয়ে অবশেষে গ্লাভস তুলে রাখেন। রামোসের রক্ষণসঙ্গী রাফায়েল ভারানের শেষটা অবশ্য সুখকর হয়নি। তারপর কেটে গেছে ১৩ বছরের বেশি। এই একাদশের সবচেয়ে চমকপ্রদ গল্পটা সম্ভবত ফাবিও কোয়েন্ত্রাওয়ের। ক্লাবটির হয়ে ১৬ ম্যাচে করেছিলেন ১০ গোল। আপাতত অবশ্য প্রচারের আলো থেকে দূরেই আছেন।
দিয়েগো লোপেজ: বিতর্ক পেরিয়ে সহকারী কোচ
ইকার ক্যাসিয়াসকে একাদশ থেকে বাদ দিয়ে দিয়েগো লোপেজকে গোলপোস্টের দায়িত্ব দেওয়ার ঘটনাটি মরিনিওর রিয়াল অধ্যায়ের অন্যতম বড় বিতর্ক ছিল। লোপেজ পেশাদার ফুটবলার হিসেবে ৪০ বছর বয়স পার করেও খেলেছেন এবং ৩ বছর আগেও লা লিগার দল রায়ো ভায়েকানোতে ছিলেন। অবসর গ্রহণের পর তিনি রিয়ালে ফিরে এসে কাস্তিয়া দলের গোলকিপিং কোচের দায়িত্ব নেন। পরবর্তীতে মূল দলের দায়িত্ব পালনকালে মরিনিও তাঁকে নিজের অস্থায়ী সহকারী হিসেবেও ডাগআউটে যুক্ত করেন। একসময় যাঁকে নিয়ে বিতর্কে জড়িয়েছিলেন মরিনিও, সেই লোপেজই এখন তাঁর সহকারী। তবে নতুন জীবনেও বিতর্ক পিছু ছাড়েনি। তখন অনেকেই তাঁকে নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন।
সের্হিও রামোস: নতুন ক্লাবের খোঁজে
বয়স প্রায় ৪০ হলেও এখনও বুটজোড়া তুলে রাখার কোনো পরিকল্পনা নেই স্প্যানিশ ডিফেন্ডার সের্হিও রামোসের। গত ডিসেম্বরে মেক্সিকোর দল মন্তেরেই ছাড়ার পর থেকে তিনি মুক্ত খেলোয়াড় হিসেবে আছেন। বিনা ট্রান্সফার ফিতে দানি কারভাহালকে চুক্তিভুক্ত করা হেতাফে এখন রামোসকেও দলে ভেড়াতে আগ্রহ দেখাচ্ছে। এ বিষয়ে হেতাফের সভাপতি আনহেল তোরেস রেডিও নাসিওনালকে জানান, দীর্ঘদিন ধরে ভাবনার পর রামোসকে সম্ভাব্য খেলোয়াড়দের তালিকায় রাখা হয়েছে এবং তাঁর আগমন ঘটতে পারে।
রাফায়েল ভারান: মাঠের ফুটবল থেকে পরিচালনা পর্ষদে
ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ছাড়ার পর ইতালির ক্লাব কোমোতে যোগ দিয়েছিলেন ফরাসি ডিফেন্ডার রাফায়েল ভারান। তবে চোটের কারণে মাত্র একটি ম্যাচ খেলেই তাঁকে খেলোয়াড়ি জীবনের ইতি টানতে হয়। কোমো কর্তৃপক্ষ তাঁকে ক্লাবের পরিচালনা পর্ষদে অন্তর্ভুক্ত করেছে, যেখানে তাঁর মূল কাজ তরুণ ফুটবলারদের বিকাশ ঘটানো। নতুন এই ভূমিকা সম্পর্কে ভারান মন্তব্য করেছিলেন যে, মাঠ থেকে বোর্ডরুমে যাওয়া ফুটবল যাত্রার শেষ নয় বরং এটি একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা। অবসরের পর ক্লাবের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য করা হয় ভারানকে।
পেপে: কোচিং স্টাফ ও প্রদর্শনী ম্যাচ
পর্তুগালের সাবেক তারকা ডিফেন্ডার পেপে ২০২৪ সালে দীর্ঘ খেলোয়াড়ি জীবনের ইতি টানেন। ক্যারিয়ারের শেষ পাঁচ বছর তিনি তাঁর পুরোনো ক্লাব পোর্তোয় খেলেছেন। গত গ্রীষ্মে মরিনিও পেপেকে তাঁর কোচিং স্টাফে যুক্ত করার বিষয়ে আলোচনা করলেও বিষয়টি চূড়ান্ত রূপ পায়নি। বর্তমানে মাঝে মাঝেই রিয়াল মাদ্রিদ কিংবদন্তিদের প্রীতি ম্যাচে মাঠে নামেন পেপে। কারণ, অনেক দিন ধরেই আমরা বিষয়টি নিয়ে ভাবছি।
ফাবিও কোয়েন্ত্রাও: ফুটবল ছেড়ে সমুদ্রের জেলে
ফুটবল ছাড়ার পর বেশিরভাগ তারকা কোচিং বা ধারাভাষ্যে গেলেও ফাবিও কোয়েন্ত্রাও পুরোপুরি ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছেন। তিনি এখন বাণিজ্যিক মাছ ধরার নৌকার মালিক ও পেশাদার জেলে। নিজ পারিবারিক ঐতিহ্য অনুসরণের কথা জানিয়ে ২০২১ সালে তিনি বলেন, ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়ার স্মৃতিই তাঁর আসল জীবন ছিল। ফুটবল ক্যারিয়ার শেষে জীবনের নতুন পথ হিসেবে তিনি এই সমুদ্র ও নৌকাকেই বেছে নিয়েছেন। তবে ২০২৫ সালে অনুমোদন ছাড়া সামুদ্রিক ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগে পর্তুগিজ কর্তৃপক্ষ তাঁর কাছ থেকে এক টনের বেশি ঝিনুকজাতীয় খাবার জব্দ করে। ২০২১ সালে বলেছিলেন, ‘আমার বাবার নৌকা ছিল। তবে ফুটবলের টান পুরোপুরি কাটাতে পারেননি। তবে কোচ হওয়ার স্বপ্নও পুরোপুরি ছাড়েননি।
মাইকেল এসিয়েন: আফ্রিকান প্রতিভা গড়ার কারিগর
ঘানার প্রাক্তন মিডফিল্ডার মাইকেল এসিয়েন ২০২০ সাল থেকে ডেনমার্কের ক্লাব নর্ডসিয়াল্যান্ডের সহকারী কোচ হিসেবে কাজ করছেন। ঘানার রাইট টু ড্রিম একাডেমির সাথে এই ক্লাবের যৌথ অংশীদারত্ব থাকায় মোহাম্মদ কুদুস, সিমন আদিংগ্রা ও কালেব ইয়েরেঙ্কির মতো প্রতিভাদের উঠে আসার পেছনে তাঁর সরাসরি অবদান রয়েছে। মাঠের সাবেক এই তারকা এখন আফ্রিকাসহ বিশ্বের উদীয়মান ফুটবলারদের ভবিষ্যৎ গঠনে ভূমিকা রাখছেন। এসিয়েনের কাজ এখন ঘানাসহ বিভিন্ন দেশের তরুণ প্রতিভাদের তৈরি করা।
লুকা মদরিচ: ৪১ বছরেও মাঠের কেন্দ্রবিন্দু
রিয়াল মাদ্রিদে কঠিন শুরুর মুখোমুখি হলেও মরিনিওর আস্থায় নিজেকে প্রমাণ করেছিলেন ক্রোয়েশিয়ান তারকা লুকা মদরিচ। এক দশকেরও বেশি সময় রিয়ালে কাটানোর পর ২০২৫ সালে তিনি এসি মিলানে যোগ দেন। ৪১ বছর বয়সেও ইতালিয়ান সিরি ‘আ’র প্রথম মৌসুমে ৩০টির বেশি ম্যাচ খেলেছেন তিনি। চলতি মৌসুমে মিলানের কোচ রুবেন আমোরিম প্রথম সাতটি লিগ ম্যাচেই তাঁকে মাঠে নামিয়েছেন। ৪১ বছর বয়সেও মদরিচের থামার নাম নেই।
হোসে কায়েখন ও কাকা: ক্যারিয়ার পরবর্তী জীবন
২০২৫ সালে স্পেনের তৃতীয় বিভাগের ক্লাব মারবেইয়ায় খেলে অবসরে যান হোসে কায়েখন। পরবর্তীতে নিজের শহরের ক্লাব পুয়ের্তো মোত্রিলে নিচের স্তরের ফুটবলে কিছুদিন অংশ নিলেও এখন প্রচারণার বাইরে রয়েছেন এই উইঙ্গার। অন্যদিকে ২০১৭ সালে বিদায় নেওয়া ব্রাজিলের ব্যালন ডি’অর জয়ী তারকা কাকা ফিফার শুভেচ্ছাদূত ও ক্রীড়া বিপণনে কাজ করছেন। তবে ভবিষ্যতে কোচিংয়ে ফেরার সম্ভাবনা উসকে দিয়ে কাকা জানান, তিনি হার্ভার্ডে স্পোর্টস বিজনেস এবং ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশনে কোচিং কোর্স শেষ করেছেন, যা জাতীয় দলের প্রয়োজনে কাজে লাগাতে প্রস্তুত। জাতীয় দল ও বিশ্বকাপের অভিজ্ঞতাও আছে।
আলভারো মোরাতা ও করিম বেনজেমা: জটিল পরিস্থিতি
মরিনিওর হাতে উঠে আসা আলভারো মোরাতা গত মৌসুমে কোমোর হয়ে ৩০ ম্যাচে মাত্র ১টি গোল করার পর বর্তমানে ধারে লেগানেসে খেলছেন। ফলে ২০১২-১৩ মৌসুমে রিয়ালের কাস্তিয়া দলের পর প্রথমবার স্পেনের দ্বিতীয় বিভাগে নামতে হলো তাঁকে। অন্যদিকে ২০১৩ সালের সেই এল ক্লাসিকোয় প্রথম গোল করা করিম বেনজেমার অবস্থান বেশ অনিশ্চিত। সৌদি প্রো লিগের সাথে ২০৩০ সাল পর্যন্ত চুক্তি থাকা সত্ত্বেও গত গ্রীষ্মে আল হিলালের সাথে চুক্তি বাতিলের সমঝোতায় পৌঁছান এই ফরাসি স্ট্রাইকার। লা লিগায় দুর্দান্ত ছন্দে থাকা বার্সেলোনার বিপক্ষে এবার রিয়ালের সামনে ব্যবধান কমানোর চ্যালেঞ্জও।
