
সরকারি কেনাকাটা ও নির্মাণকাজের দরপত্রে অভিজ্ঞতার কঠিন শর্ত শিথিল করে নতুন উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরিতে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (দ্বিতীয় সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর একটি খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে, যা সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থাপিত হওয়ার কথা রয়েছে। খসড়াটি আজ সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে উত্থাপিত হতে পারে। এ ব্যবস্থায় সরকারি দপ্তরের ব্যয়ের হিসাবও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হবে।
১৩ পৃষ্ঠার এই খসড়ায় মোট ৩৬টি ধারা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি (বিপিপিএ) গত ২৯ অক্টোবর এ বিষয়ে জনগণের মতামত আহ্বান করেছে।
এর আগে ২১ সেপ্টেম্বর ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬’ জারি করা হয়েছিল, এবার সেই অধ্যাদেশের আলোকে নতুন এই সংশোধনী আইনটি আসছে। এর আগে সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় বিভিন্ন পরিবর্তন এনে গত ২১ সেপ্টেম্বর ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬’ গেজেটে প্রকাশ করা হয়।
নতুন এই খসড়ায় ঠিকাদার বাছাইয়ের পদ্ধতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
বিশেষ করে দেশের ভেতরে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে নির্মাণকাজ ও ভৌত সেবা কেনার ক্ষেত্রে কাজের মান ও স্থায়িত্বকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
নতুন প্রস্তাবনা অনুযায়ী, মান ও স্থায়িত্বের জন্য মোট নম্বরের ৮০ শতাংশ এবং দর বা দামের জন্য ২০ শতাংশ নম্বর বরাদ্দ থাকবে। সহজভাবে বিষয়টি বোঝাতে মোট নম্বর ১০০ ধরা যায়। কোনো প্রতিষ্ঠান মানের অংশে ৮০ নম্বরের মধ্যে ৭২ এবং দামের অংশে ২০ নম্বরের মধ্যে ১৬ পেলে তার মোট হবে ৮৮। অন্য প্রতিষ্ঠান মানে ৬৪ এবং দামে পুরো ২০ পেলেও মোট হবে ৮৪। তখন প্রথম প্রতিষ্ঠানটি এগিয়ে থাকবে। মান ও দামের নম্বর মিলিয়ে নির্বাচনের ধারণা সেপ্টেম্বরের অধ্যাদেশেও ছিল। এই বিশেষ ব্যবস্থার বাইরের অন্যান্য প্রযোজ্য কেনাকাটায় সর্বনিম্ন মূল্যায়িত যোগ্য দরপত্রদাতা নির্বাচনের বিধান বহাল থাকবে।
এই দুই অংশের নম্বর যোগ করে যার মোট নম্বর সবচেয়ে বেশি হবে, তাকেই কাজ দেওয়ার জন্য সুপারিশ করা হবে। অর্থাৎ সর্বনিম্ন দরদাতা হলেই কাজ পাওয়ার পুরোনো প্রথা থেকে সরে এসে গুণগত মান ও স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। ফলে সবচেয়ে কম দর দেওয়া প্রতিষ্ঠানই যে কাজ পাবে, এমন নিশ্চয়তা থাকছে না। এই অংশে প্রতিষ্ঠানটির যোগ্যতা ও সক্ষমতার পাশাপাশি কাজটি কীভাবে করা হবে, নির্ধারিত মান কীভাবে নিশ্চিত হবে এবং কাজটি কতটা টেকসই হবে, তা দেখা হবে। কারণ, ওই হিসাবের ভিত্তিতেই প্রথমে নির্ধারিত হবে কোন দরগুলো প্রতিযোগিতায় থাকবে।
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী ও ক্রয় সংস্কার কমিটির সদস্য মীর শাহে আলম জানান, বর্তমানে প্রচলিত কঠিন শর্তের কারণে ঘুরেফিরে একই ঠিকাদারেরা বারবার কাজ পাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় গঠিত এই কমিটির লক্ষ্য ছিল সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়াকে আরও অর্থবহ করা। নতুন আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে, দরদাতার যোগ্যতা নির্ধারণে এমন কোনো শর্ত রাখা যাবে না যা অযৌক্তিকভাবে নবীন উদ্যোক্তা বা নতুন নিবন্ধিত ব্যক্তিদের প্রতিযোগিতার বাইরে ঠেলে দেয়। কেবল দীর্ঘদিনের কাজের অভিজ্ঞতা বা বিশাল আর্থিক লেনদেনের বাধ্যবাধকতা দিয়ে এখন থেকে কাউকে আর বঞ্চিত করা যাবে না। এসব বিষয় পর্যালোচনার জন্য প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আইনমন্ত্রীর নেতৃত্বে কমিটি গঠন করা হয়।
তবে নতুন উদ্যোক্তাদের সুযোগ দেওয়ার মানে এই নয় যে সব শর্ত তুলে দেওয়া হচ্ছে। কাজের ধরন, ঝুঁকি ও কারিগরি জটিলতা বিবেচনা করে যৌক্তিক শর্ত আরোপের ক্ষমতা থাকবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হাতে। অর্থাৎ, সক্ষমতা যাচাইয়ের প্রক্রিয়া বজায় থাকবে কিন্তু অপ্রয়োজনীয় বাধা অপসারিত হবে। খসড়ায় ‘সুযোগবঞ্চিত ব্যক্তি’ নামে একটি নতুন শ্রেণি প্রস্তাব করা হয়েছে। যারা গত ২০ বছরে লাইসেন্স থাকার পরও প্রয়োজনীয় সুযোগ বা অনুকূল পরিবেশের অভাবে সরকারি কাজে অংশ নিতে পারেননি, তারা এই তালিকার অন্তর্ভুক্ত হবেন। প্রস্তাবিত আইন কার্যকরের আগের সর্বোচ্চ ২০ বছরের মধ্যে বৈধ নিবন্ধন বা লাইসেন্স থাকার পরও প্রয়োজনীয় সুযোগ কিংবা অনুকূল পরিবেশের অভাবে সরকারি ক্রয়ে অংশ নিতে পারেননি অথবা নেননি—এমন ব্যক্তিরা এই শ্রেণিতে পড়বেন।
নতুন ও ছোট প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে এলাকাভিত্তিক তালিকাভুক্তির ব্যবস্থাও খসড়ায় রাখা হয়েছে। নির্দিষ্ট শ্রেণি অনুযায়ী তালিকা তৈরি করে সীমিত দরপত্রের মাধ্যমে পণ্য ও সেবা কেনা হবে। তবে বিশেষায়িত বা কারিগরি কাজের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কার্যালয় প্রধানের অনুমোদনে উন্মুক্ত দরপত্র বা অন্য কোনো স্বীকৃত পদ্ধতি ব্যবহারের সুযোগ থাকবে। তালিকাভুক্ত হলেও কোনো ঠিকাদার সরাসরি কাজ পাবেন না; বরং ওই তালিকায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেই প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে যোগ্যতম প্রতিষ্ঠানকে বেছে নিতে হবে। নতুন ঠিকাদার ও সরবরাহকারী হিসেবে আগ্রহী অনেকে অংশ নিতে পারছেন না। নতুন ও ছোট প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ বাড়ানোর আরেকটি ব্যবস্থা হলো এলাকাভিত্তিক তালিকাভুক্তি। দেশীয় পণ্যে অগ্রাধিকার, অনিয়মে ব্যবস্থা।
দরপত্রে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে আর্থিক সীমার বিষয়েও নতুন নিয়ম আসছে। যদিও দরপত্রের নির্দিষ্ট মূল্যসীমা বিধিতে নির্ধারিত হবে, তবে খসড়ায় ভারসাম্য রক্ষার ইঙ্গিত রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো কাজের প্রাক্কলিত ব্যয় ১০ কোটি টাকা হলে, গ্রহণযোগ্য দর হবে ৯ কোটি থেকে ১১ কোটি টাকার মধ্যে। কোনো প্রতিষ্ঠান ৯ কোটি টাকার নিচে দর দিলে বা ১১ কোটি টাকার বেশি দর দিলে তাদের প্রস্তাব বাতিল বলে গণ্য হবে। আগে নির্মাণকাজের ক্ষেত্রে ১০ শতাংশের যে সীমা ছিল, ২০২৫ সালের সংস্কারে তা তুলে দেওয়া হলেও এখন আবার সুনির্দিষ্ট সীমারেখা নির্ধারণের পথে হাঁটছে সরকার। খসড়ায় আগের অধ্যাদেশটি রহিত করার প্রস্তাবও রয়েছে। এবারের খসড়ায় নির্ধারিত মূল্যসীমার মধ্যে দেশের অভ্যন্তরীণ কেনাকাটায় এই পদ্ধতির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে। তবে কত টাকা পর্যন্ত কেনাকাটায় নিয়মটি প্রযোজ্য হবে, তা খসড়ায় উল্লেখ নেই। তবে জামানতের পরিমাণ বা শর্ত উল্লেখ করা হয়নি। আবার ১১ কোটি টাকার বেশি দর দিলেও প্রতিষ্ঠানটি প্রতিযোগিতা থেকে বাদ পড়বে।
সিপিটিইউ বা বর্তমান বিপিপিএর সাবেক মহাপরিচালক মো. ফারুক হোসেন বলেন, দীর্ঘদিন কাজ না পাওয়ার কারণ কেবল রাজনৈতিক বঞ্চনা নয়, বরং দরপত্রের প্রক্রিয়া ও যোগ্যতার শর্তাবলিও বড় বিষয়। তার মতে, নতুনদের জায়গা দিতে গিয়ে যেন বিশেষ কাউকে অন্যায্য সুবিধা দেওয়া না হয়, সেদিকেও নজর রাখা জরুরি। নতুন আইনের অধীনে মূল্যায়ন কমিটিকে দরপত্র দলিলে উল্লেখিত মানদণ্ড কঠোরভাবে পালন করতে হবে এবং সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়া প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও কারিগরি সক্ষমতা যাচাই নিশ্চিত করতে হবে।
