
এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণ প্রত্যাশী জোটের পক্ষ থেকে দেশের ছয় লক্ষাধিক শিক্ষক-কর্মচারীর ন্যায্য অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে তিন দফা দাবি উত্থাপন করা হয়েছে। বুধবার রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জোটের সদস্য সচিব অধ্যক্ষ দেলাওয়ার হোসেন আজিজী এই দাবিগুলো তুলে ধরেন। তিনি স্পষ্ট করে জানান, আগামী ৩০ ডিসেম্বর ২০২৬ তারিখের মধ্যে সরকার যদি এই দাবি পূরণের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ঘোষণা ও কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তবে কঠোর আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। আগামী ৩০ ডিসেম্বরের মধ্যে এসব দাবি বাস্তবায়ন করা না হলে কঠোর আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা। এ বিষয়ে অধ্যক্ষ আজিজী জানান, গত ৩১ অক্টোবর দেশের শতাধিক জেলা ও উপজেলায় মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
জোটের প্রধান তিনটি দাবির মধ্যে রয়েছে—এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জন্য অবিলম্বে বদলি ব্যবস্থা চালু করা, নবম পে স্কেল অনুযায়ী বেতন-ভাতা প্রদান এবং আগামী ঈদুল ফিতর থেকে শতভাগ উৎসব ভাতা নিশ্চিত করা।
অধ্যক্ষ দেলাওয়ার হোসেন আজিজী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক-কর্মচারীরা নানামুখী বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। বিশেষ করে বদলির অভাবে অনেক শিক্ষক নিজ পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে দূরবর্তী স্থানে কর্মরত আছেন। তিনি নিজের উদাহরণ টেনে জানান, বাড়ি থেকে প্রায় ১৬৯ কিলোমিটার দূরে চাকরি করার ফলে পারিবারিক দায়িত্ব পালন করা তার জন্য দুরূহ হয়ে পড়েছে। তিনি বদলিকে শিক্ষকদের মানবিক ও পারিবারিক অধিকার হিসেবে উল্লেখ করেন। স্ত্রী-সন্তান ও অসুস্থ মা-বাবাকে রেখে অনেককেই দূরবর্তী এলাকায় চাকরি করতে হচ্ছে। অধ্যক্ষ দেলাওয়ার হোসেন আজিজী বলেন, আমিও নিজ পরিবারের কাছ থেকে প্রায় ১১০ কিলোমিটার এবং নিজ বাড়ি থেকে ১৬৯ কিলোমিটার দূরে চাকরি করছি। তাই আর বিলম্ব না করে বদলির আদেশ জারি করতে হবে।
বেতন-বৈষম্য নিরসনে নবম পে স্কেল বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে জোটের নেতারা বলেন, একই শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পেশাগত দায়িত্ব পালন করা সত্ত্বেও এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা সুযোগ-সুবিধার দিক থেকে পিছিয়ে রয়েছেন। সম্প্রতি সরকার এমপিওভুক্ত স্কুল-কলেজের শিক্ষক-কর্মচারীদের নবম পে স্কেল অনুযায়ী বেতন দেওয়ার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠালেও, মাদ্রাসা ও কারিগরি পর্যায়ের শিক্ষকদের জন্য অনুরূপ উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে তারা অভিযোগ করেন। দ্রুত সব পর্যায়ের শিক্ষকদের জন্য অর্থ বরাদ্দের দাবি জানিয়েছেন তারা। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১ নভেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে এমপিওভুক্ত স্কুল-কলেজের শিক্ষক-কর্মচারীদের নবম পে স্কেল অনুযায়ী বেতন-ভাতা প্রদানের জন্য অর্থ বরাদ্দ চেয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তার মতে, শুধু উদ্যোগ নিলেই হবে না, দ্রুত কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণের পাশাপাশি তা বাস্তবায়নও নিশ্চিত করতে হবে।
উৎসব ভাতার বিষয়ে নেতারা বলেন, বর্তমানে মূল বেতনের মাত্র ৫০ শতাংশ উৎসব ভাতা দেওয়া হয়, যা বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় একেবারেই অপর্যাপ্ত। আসন্ন ঈদুল ফিতর থেকেই শতভাগ উৎসব ভাতা প্রদানের জন্য তারা সরকারের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন। তারা উল্লেখ করেন যে, আশ্বাস বা অনির্দিষ্ট সময়ের প্রতিশ্রুতিতে শিক্ষক-কর্মচারীরা আর সন্তুষ্ট নন, এখন কার্যকর বাস্তবায়নই তাদের কাম্য। এটিকে বৈষম্যমূলক উল্লেখ করে নেতারা বলেন, ঈদের মতো গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও পারিবারিক উৎসবেও শিক্ষক-কর্মচারীরা পূর্ণাঙ্গ উৎসব ভাতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, পূর্বে ৪ নভেম্বর প্রেসক্লাবের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালনের পরিকল্পনা ছিল। তবে শিক্ষামন্ত্রণালয়ের বর্তমান উদ্যোগের প্রতি সম্মান জানিয়ে এবং রাজধানীসহ দেশের সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির কথা বিবেচনায় নিয়ে কর্মসূচির ধরন পরিবর্তন করা হয়েছে। নেতারা জোর দিয়ে বলেন যে, সংবাদ সম্মেলন আয়োজনের অর্থ এই নয় যে তাদের আন্দোলন স্থগিত হয়েছে; বরং দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তাদের সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে।
অধ্যক্ষ দেলাওয়ার হোসেন আজিজী আরও বলেন, তারা সরকারবিরোধী কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চান না। বরং আলোচনার মাধ্যমেই একটি সম্মানজনক সমাধান প্রত্যাশা করছেন। শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন এবং শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা রক্ষাই তাদের প্রধান লক্ষ্য। সংবাদ সম্মেলনের শেষ পর্যায়ে তারা পুনরায় সরকারের প্রতি দাবিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান জানান।
