
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রতিষ্ঠাকালীন নেতাদের অন্যতম ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী সামান্তা শারমিন দল থেকে পদত্যাগ করেছেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের এই প্ল্যাটফর্মের অন্যতম জ্যেষ্ঠ আহ্বায়ক ছিলেন তিনি। গত বৃহস্পতিবার বিকেলে এনসিপির আহ্বায়ক মো. নাহিদ ইসলামের কাছে হোয়াটসঅ্যাপে তিনি পদত্যাগপত্র পাঠান। একই সঙ্গে দলের অভ্যন্তরীণ গ্রুপেও বিষয়টি সবাইকে অবহিত করেছেন তিনি। সর্বশেষ গত ২৩ অক্টোবর দল পুনর্গঠিত হলে সেখানে তাকে যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়েছিল, কিন্তু পদাবনতির মাত্র দুই সপ্তাহ পরই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিলেন। পদত্যাগের বিষয়ে জানতে চাইলে সামান্তা শারমিন আজ সন্ধ্যায় বলেন, ‘বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে আমি এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে হোয়াটসঅ্যাপে পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছি। কাউন্সিল এড়িয়ে এনসিপির কমিটি পুনর্গঠন নিয়েও নিজের অসন্তোষের কথা উল্লেখ করেছেন সামান্তা শারমিন।
দল ছাড়ার সুনির্দিষ্ট কারণ ব্যাখ্যা করে সামান্তা শারমিন জানান, নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শন বা ‘লাইন’ স্পষ্ট না থাকায় জাতীয় নাগরিক পার্টি বর্তমানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আদর্শের মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে। গণ-অভ্যুত্থানের নেপথ্যের তরুণরা যে রাজনৈতিক শক্তি গড়তে চেয়েছিল, এনসিপি এখন তার বিপরীতে বিভিন্ন ইস্যুতে জামায়াতের সহায়ক বা প্রতিক্রিয়ামূলক ভূমিকা পালন করছে। এছাড়া জামায়াতের মতো বড় রাজনৈতিক দলের ‘লেজুড়বৃত্তি’ করা দলটির নতুন রাজনীতির সম্ভাবনাকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
নারীবিরোধী ও রক্ষণশীল রাজনৈতিক ধারার সঙ্গে এনসিপির বর্তমান অবস্থানের মিল পাওয়া যাচ্ছে বলেও অভিযোগ সামান্তার। তিনি বলেন, অভ্যন্তরীণ কোনো কাউন্সিল ছাড়াই কমিটি পুনর্গঠনের মতো বিষয়েও তিনি বেশ অসন্তুষ্ট ছিলেন। এসব বিষয়ে বারবার পুনর্বিবেচনা করার আহ্বান জানানো সত্ত্বেও এনসিপির নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে কোনো ইতিবাচক সাড়া মেলেনি, যার ফলে শেষ পর্যন্ত পদত্যাগের পথ বেছে নিতে হয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে জাতীয় নাগরিক কমিটি গঠিত হলে সামান্তা শারমিন তার মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর গত ফেব্রুয়ারিতে এনসিপি আত্মপ্রকাশ করলে তিনি জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক হন। তবে গত ডিসেম্বরে জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এনসিপি যখন জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়, তখন থেকেই দলীয় কার্যক্রমে সামান্তার সক্রিয়তা কমে যায়।
দল ছাড়ার পরবর্তী পরিকল্পনা নিয়ে সামান্তা শারমিন জানান, মানুষ তরুণদের কাছ থেকে এমন একটি রাজনৈতিক শক্তির প্রত্যাশা করেছিল যারা পুরোনো ক্ষমতাকাঠামোর পুনরাবৃত্তি করবে না। বরং যারা নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও জাতীয় স্বার্থভিত্তিক রাজনীতির পথ তৈরি করবে। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের তরুণদের সামনে এখন চ্যালেঞ্জ কেবল নতুন দল গঠন করা নয়, বরং এমন একটি রাজনৈতিক ঐক্য গড়া, যেখানে বিভাজন নয় বরং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যই মূল চালিকাশক্তি হবে। গণতন্ত্র, সার্বভৌমত্ব, নারীর সমান অংশগ্রহণ, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নগুলো এখনো নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগের অপেক্ষায় আছে। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে তরুণ সমাজ যদি আবার সংগঠিত হওয়ার উদ্যোগ নেয়, তবে তা হতে হবে অতীতের কোনো দলের পুনরাবৃত্তি নয়, বরং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নির্মাণের নতুন প্রচেষ্টা।’।
সামান্তা আরও বলেন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক থাকবে, কিন্তু বাংলাদেশের স্বার্থের ঊর্ধ্বে কোনো বিদেশি শক্তির অবস্থান থাকা উচিত নয়। তরুণদের নিয়ে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার নতুন প্রকল্প এগিয়ে নিতে তিনি অঙ্গীকারবদ্ধ। যারা এই প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত হতে আগ্রহী, তাদের সঙ্গে বিস্তারিত মতবিনিময়ের জন্য আহ্বান জানিয়েছেন সামান্তা শারমিন। এই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে কাজ করতে যাঁরা অঙ্গীকারাবদ্ধ, তাঁদের সঙ্গে এ বিষয়ে বিস্তারিত মতবিনিময় করতে চান, সবাইকে যোগাযোগ করার আহ্বান জানিয়েছেন সামান্তা শারমিন।
