
সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার শ্রীউলা ইউনিয়নের কলিমাখালী গ্রামে বসবাস করেন ফারজানা আক্তার। সংসারের হাল ধরতে তিনি সেলাই মেশিনে কাপড় সেলাইয়ের কাজ করেন। নিজের আয় আর অসুস্থ স্বামীর মাছ ব্যবসায় সহায়তার সীমিত আয়ে চলে তাঁদের চারজনের সংসার। ফারজানার মাসে আয় এক থেকে দেড় হাজার টাকা, আর স্বামীর আয় পাঁচ হাজার টাকা। মাসে ছয় থেকে সাড়ে ছয় হাজার টাকার সম্মিলিত আয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে, যার ফলে প্রায়শই ধারদেনা করতে হয় তাঁদের। কিছুদিন আগেও ছোট ননদের কাছ থেকে পাঁচ হাজার টাকা ধার নিতে হয়েছে, এমনকি প্রয়োজন মেটাতে দুইটা ছাগলও বিক্রি করতে হয়েছে ফারজানাকে। এই সামান্য আয় দিয়েই চালাতে হয় সংসার। কত টাকায় কাপড় কিনতে হবে, সেলাই করে কত আয় হবে, সেই টাকা দিয়ে কোন খরচ মেটাবেন—এসব ভাবনা ঘুরেফিরে আসে তাঁর দৈনন্দিন জীবনে। ফারজানা বলেন, ‘বড্ড আফসোস হয়, পড়াশোনাটা যদি করতি পারতাম।
ফারজানার সংসার ও জীবনের গল্পটা সহজ নয়।
১৯৮৮ সালে এক প্রাকৃতিক দুর্যোগে যখন তাঁর বয়স মাত্র দুই মাস, তখন তিনি মা-কে হারান। পরিবারের কাছ থেকে শুনেছেন, মায়ের নিথর দেহের পাশে তাঁকে জীবিত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল। মামাদের আশ্রয়ে বড় হওয়া ফারজানা ছোটবেলায় অভাবের কারণে পড়াশোনা বেশি দূর এগিয়ে নিতে পারেননি। তৃতীয় শ্রেণি থেকে স্থানীয় লুৎফর মাস্টারের বাড়িতে গৃহস্থালির কাজ শুরু করেন তিনি, যা সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত স্থায়ী হয়। নিজের পড়াশোনা শেষ করতে না পারার আক্ষেপ আজও তাঁকে তাড়া করে। ফারজানা জানান, এখনো মেয়ের বই পড়লে অনেক কিছু বুঝতে পারেন তিনি, এমনকি মেয়ের বানানের ভুলও ধরে দিতে পারেন। নিজের অনেক চাওয়া অপূর্ণ থাকলেও ছেলেমেয়ের পড়াশোনা যেন থেমে না যায়, সেটাই তাঁর বড় স্বপ্ন। ১৯৮৮ সালের এক দুর্যোগের (বন্যা নাকি ঘূর্ণিঝড় মনে করতে পারলেন না তিনি) সময় তাঁর বয়স ছিল প্রায় দুই মাস। আমার মেয়েটা বলে, ওর চাইতে নাকি আমার মাথার ব্রেন ভালো।
অভাবের কারণে নিজের ঘরটির দেয়ালও ভেঙে পড়েছে। হাঁড়ি-পাতিল, কাপড়চোপড় আর বইপত্রের ঠাসাঠাসি এই সংসারে সন্তানদের পড়াশোনার প্রতি টান স্পষ্ট। বর্তমানে ফারজানার সেলাই মেশিনটি স্থানীয় লুৎফর মাস্টারের নতুন একটি ঘরে রাখা হয়েছে, যেখানে তিনি কাজের ফাঁকে বসেন। ফারজানার ছেলে তামিম হোসেন নবম শ্রেণিতে পড়ছে। আর মেয়ে আয়েশা এ বছর বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে। সাফল্যের কৃতিত্বে আয়েশা বর্তমানে সাতক্ষীরা সরকারি কলেজে পড়ছে এবং হোস্টেলে থাকে। ফারজানাদের বাড়ির মাটির দেয়ালের কোথাও কোথাও ভেঙে গেছে। ঘরের ভেতরে বিছানা, হাঁড়ি-পাতিল, কাপড়চোপড়—সংসারের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র অল্প জায়গার মধ্যে রাখা। সংসারের টানাপোড়েনের মধ্যেও সন্তানদের পড়াশোনার চিহ্ন রয়েছে ঘরের এই ছোট্ট জায়গায়। ফারজানাদের ঘরের অবস্থা খারাপ দেখে তিনি নতুন ঘরটি সাময়িকভাবে ব্যবহার করতে দিয়েছেন। ও বানান ভুল করলি আমি ধরিয়ে দিতি পারি।
মেয়ের ফলাফলের কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত ফারজানা বলেন, জীবনের সবচেয়ে আনন্দ পেয়েছেন সেদিন, যেদিন মেয়ের এ প্লাস পাওয়ার খবর শুনেছিলেন। সেদিন আশপাশের মানুষ এসে তাঁর মেয়েকে আদর করেছিলেন। তিনি যেকোনো মূল্যে সন্তানদের পড়াশোনা শিখিয়ে মানুষ করার স্বপ্ন দেখেন। এ প্লাস পাইছে শুনে আশপাশের মানুষও আমার বাড়িতে আইসে মেয়েডারে আদর করিছে। যত কষ্টই হোক, মেয়েডারে লেখাপড়া শিখাতি চাই।’।
বর্তমানে চোখের সমস্যার কারণে সুইয়ে সুতা পরাতেও কষ্ট হয় ফারজানার। অভাবের টানাপোড়েনে এক খরচ মেটাতে গেলে অন্যটি পিছিয়ে পড়ে। তবুও সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি আশাবাদী। নিজের উপার্জন বাড়িয়ে তিনি সন্তানদের পথ সহজ করতে চান। ছেলে প্রতিষ্ঠিত হোক আর মেয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাক—এই চাওয়া নিয়েই প্রতিদিন সেলাইয়ের কাজের ফাঁকে সংসারের কঠিন হিসাব মেলান ফারজানা।
