
খুলনার বড় বাজারের মসলাপট্টিতে গেলে এখন চুইঝালের তীব্র ঝাঁজালো ঘ্রাণ পাওয়া যায়। পানের সমগোত্রীয় এই উদ্ভিদটি মরিচ আসার আগে থেকেই উপমহাদেশে রান্নায় ঝাঁজ তৈরির প্রাকৃতিক উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সময়ের পরিক্রমায় এর ব্যবহার খুলনা ও যশোর অঞ্চলের বসতবাড়িতে সীমাবদ্ধ থাকলেও, বর্তমানে এটি একটি সম্ভাবনাময় কৃষিপণ্যে পরিণত হয়েছে। খাসি, গরু কিংবা হাঁসের মাংসের স্বাদ বাড়াতে এর জুড়ি নেই। এছাড়া গ্যাস্ট্রিক, কোষ্ঠকাঠিন্য ও সর্দি-কাশির মতো সমস্যায় লোকজ চিকিৎসায় চুইঝালের ব্যবহার দীর্ঘদিনের। রান্নাঘরের এই স্বতন্ত্র মসলা আসলে মরিচজাতীয় কোনো উদ্ভিদ নয়, এটি পানের নিকটাত্মীয়। পর্তুগিজদের হাত ধরে এ দেশে মরিচ আসার আগে উপমহাদেশের রান্নায় ঝাঁজ আনতে যেসব স্থানীয় মসলা ব্যবহৃত হতো, চুইঝাল তার অন্যতম। একসময় অবিভক্ত বাংলার রান্নায় এর ব্যাপক ব্যবহার থাকলেও কালের বিবর্তনে তা কেবল বৃহত্তর খুলনা ও যশোর অঞ্চলের মানুষের বসতবাড়ির আঙিনায় টিকে ছিল। চুইঝালের অনন্য স্বাদ নিতে খুলনার বড় বাজারসংলগ্ন খাবার হোটেলগুলোতে ভিড় জমান ভোজনরসিকেরা। চুইঝাল এখন আর কেবল আঞ্চলিক রান্নার উপকরণ নয়, এটি সম্ভাবনাময় এক অর্থনৈতিক সম্পদ।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২০ ও ২০২২ সালের গবেষণায় চুইয়ের নির্যাসে জীবাণুনাশক, ব্যথানাশক, অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট এবং ক্যানসার-কোষ প্রতিরোধী উপাদানের প্রমাণ মিলেছে। এটি স্নায়বিক উত্তেজনা কমায় এবং ক্ষুধামান্দ্য দূর করতে সহায়তা করে। বর্তমানে খুলনার বড় বাজারে অন্তত ১৫টি দোকান রয়েছে যেখানে শুধুমাত্র চুইঝাল বিক্রি হয়। এছাড়া অন্য মসলার দোকানেও এটি পাওয়া যায়। বড় বাজারে প্রতিদিন এক হাজার কেজির বেশি চুইঝাল কেনাবেচা হয়, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা।
চুইঝালের চাহিদা বাড়ার সাথে সাথে দামেও প্রভাব পড়েছে।
প্রবীণ ক্রেতা অবনীন্দ্রনাথ কুমার জানান, আশির দশকে প্রতি কেজি চুই মাত্র ২ টাকায় পাওয়া যেত। অথচ চুই বিক্রেতা অমল বিশ্বাসের তথ্য অনুযায়ী, তিন বছর আগে যে চুই ৮০০ টাকায় কেনা হতো, তা এখন ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। উন্নত মানের শিকড় বা মূলের দাম ১ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। খুলনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জেলায় ৬০০ টনের বেশি চুই উৎপাদিত হয়েছে, যা গত ছয় বছরে প্রায় আড়াই গুণ বেড়েছে। কেজিপ্রতি ১ হাজার ২০০ টাকা গড় দরে হিসাব করলে বর্তমান বাজারের আকার ৭০ কোটি টাকার বেশি হলেও, স্থানীয়দের মতে এর প্রকৃত বাজার প্রায় শতকোটি টাকা। গত ছয় বছরে এর উৎপাদন বেড়েছে প্রায় আড়াই গুণ।
চাষিদের আগ্রহ বাড়ায় এখন আম, কাঁঠাল বা মেহগনি গাছের সাথে সাথি ফসল হিসেবে চুই চাষ জনপ্রিয় হচ্ছে। খুলনার নার্সারিগুলোতে চারা বিক্রির পরিমাণ কয়েক বছরে ২-৩ হাজার থেকে বেড়ে ৫০-৬০ হাজারে পৌঁছেছে। খুলনার পাশাপাশি ফরিদপুর, ঝিনাইদহ ও কুড়িগ্রামেও এখন বাণিজ্যিক চাষ শুরু হয়েছে। ভোজনরসিকদের চাহিদার কারণে বড় বাজারের হোটেল জাবেদের মতো প্রতিষ্ঠানে চুই দিয়ে রান্না করা মাংসের ব্যাপক কদর রয়েছে, যেখানে প্রতিদিন প্রায় দেড় থেকে দুই মণ চুই-মাংস বিক্রি হয় এবং ক্রেতাদের লাইনে দাঁড়িয়ে খাবার সংগ্রহ করতে হয়। এই অপার সম্ভাবনা মাথায় রেখে ২০২৪ সালে শিল্প মন্ত্রণালয় জিআই পণ্যের তালিকায় চুইঝালকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। এ হিসাবের বাইরেও আরও চাষ ও বিক্রি আছে। ২০২৪ সালে শিল্প মন্ত্রণালয় সম্ভাব্য যে ১৫১টি জিআই (ভৌগোলিক নির্দেশক) পণ্যের তালিকা প্রস্তুত করেছে, তাতে খুলনার চুইঝাল অন্যতম।
