
রাজধানীর ফার্মগেট থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেলে যাতায়াত করতে ভাড়া লাগে মাত্র ২৮ টাকা। কিন্তু মতিঝিল থেকে কমলাপুর রেলস্টেশনে পৌঁছাতে যাত্রীদের অটোরিকশা ভাড়া গুনতে হয় ৪০ টাকা। সোহেল রানা নামে এক বেসরকারি কর্মকর্তা জানান, কর্মব্যস্ত জীবনে মেট্রোরেলের মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত সংযোগ চালু হলে সময় ও অর্থ দুই-ই সাশ্রয় হতো। দুর্গাপূজার ছুটিতে বাড়ি যাওয়ার পথে তাকে বাড়তি সময় ও খরচ বহন করতে হয়েছে। এবারের দুর্গাপূজার ছুটিতে ট্রেনে চড়ে গ্রামের বাড়ি মোহনগঞ্জ যাচ্ছিলেন। সেখান থেকে অটোরিকশায় ৪০ টাকা ভাড়ায় কমলাপুর রেলস্টেশনে যান। গত বুধবার দুপুর ১২টার দিকে কথা হয় সোহেল রানার সঙ্গে। তিনি বলেন, ফার্মগেট থেকে খুব কম সময়ে মেট্রোরেলে মতিঝিল পৌঁছান। রাজধানী ঢাকায় মেট্রোরেলের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। সে জন্যই কিছুটা দেরিতে চালু করতে হবে। গত সপ্তাহে সরেজমিনে মতিঝিল–কমলাপুর মেট্রোস্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনের অংশে মেট্রোরেলের অস্থায়ী সিঁড়ি দিয়ে শ্রমিকেরা ওঠানামা করছেন। দুই পাশে বিদ্যুতের খুঁটি বসানো হয়েছে। ডিসেম্বর নাগাদ তা শেষ করতে চায় কর্তৃপক্ষ।
বর্তমানে মতিঝিল স্টেশন দিয়ে প্রতিদিন প্রায় এক লাখ যাত্রী যাতায়াত করেন, যারা এখান থেকে কমলাপুরসহ বিভিন্ন গন্তব্যে ছড়িয়ে পড়েন। ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)-এর তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্ট পর্যন্ত মেট্রোরেলে মোট ৩১ কোটি ৩৫ লাখ যাত্রী ভ্রমণ করেছেন। বর্তমানে দৈনিক যাত্রী সংখ্যা সাড়ে চার লাখের ওপরে, তবে কমলাপুর পর্যন্ত বর্ধিত অংশ চালু হলে এই সংখ্যা ৬ লাখ ৭৭ হাজারে পৌঁছাবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে। তবে এই পরিকল্পনায় কিছু পরিবর্তন আনা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। অর্থাৎ বর্তমান যাত্রীর সংখ্যা সেই প্রাক্কলনের কাছাকাছি।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আগামী ফেব্রুয়ারিতে পরীক্ষামূলকভাবে মেট্রোরেল চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এরপর জুলাই মাসের শুরুতে যাত্রী নিয়ে বাণিজ্যিকভাবে ট্রেন চলাচলের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। মতিঝিল থেকে কমলাপুর অংশের ১ দশমিক ১৬ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই সম্প্রসারিত অংশে অবকাঠামো নির্মাণের কাজ প্রায় ৮৫ শতাংশ শেষ হয়েছে। কমলাপুর মেট্রোস্টেশনের নিচে বালু ও পাথর স্তূপ করে রাখা রয়েছে। মো. আবদুল ওয়াহাব বলেন, মতিঝিল–কমলাপুর অংশের অবকাঠামো নির্মাণকাজের সার্বিক অগ্রগতি ৮৫ শতাংশ।
মেট্রোরেল প্রকল্প পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. আবদুল ওয়াহাব জানান, ঠিকাদারের সাথে চুক্তি আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত থাকলেও তিন মাস আগেই কাজ সম্পন্ন করার চেষ্টা চলছে। বর্তমানে লাইন বসানোর কাজ ৩০ শতাংশ এবং বৈদ্যুতিক সংযোগের কাজ ৪০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। পাশাপাশি স্টেশনের লিফট, সংকেতব্যবস্থা ও স্বয়ংক্রিয় ভাড়া আদায়ের যন্ত্র বসানোর মতো আনুষঙ্গিক কাজগুলো চলমান রয়েছে। তবে স্টেশনের ভাড়া আদায়ের ব্যবস্থাসহ আরও কিছু যন্ত্র জাপান থেকে আসতে দেরি হতে পারে। শ্রমিকের কাজে নিয়োজিত মনির হোসেন জানান, স্টেশনের কাজ চলার কারণে নিচের সড়ক বেহাল হয়ে আছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক প্রকৌশলী বলেন, কর্তৃপক্ষের উচ্চপর্যায় থেকে জুন–জুলাইয়ে মেট্রোরেল চালুর নির্দেশনা আছে।
এই অংশের নির্মাণকাজ জাপানের জাইকার সহায়তায় পরিচালিত হচ্ছে।
ভৌত অবকাঠামো তৈরির দায়িত্ব পালন করছে থাইল্যান্ডের ইতাল-থাই ডেভেলপমেন্ট পাবলিক কোম্পানি।
ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল কাজের জন্য ভারতীয় প্রতিষ্ঠান লারসন অ্যান্ড ট্যুবরোকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। শুরুতে এই কাজের জন্য ৬৫১ কোটি টাকা ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছিল, তবে বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর দর-কষাকষির মাধ্যমে তা ১৮৬ কোটি টাকা কমিয়ে ৪৬৫ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে।
বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ সামছুল হক বলেন, কমলাপুর রেলস্টেশন এখন দেশের উত্তর, পূর্বাঞ্চলসহ পদ্মা সেতুর মাধ্যমে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ট্রেন চলাচলের কেন্দ্রবিন্দু। তাই মেট্রোরেলের এই সংযোগ চালু হলে সড়কের ওপর চাপ কমবে এবং প্রকল্পের সুফল দ্রুত পাওয়া সম্ভব হবে।
উল্লেখ্য, ২০১২ সালে অনুমোদিত ঢাকা মেট্রোরেল প্রকল্পের মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে উত্তরা থেকে আগারগাঁও এবং পরবর্তীতে ২০২৩ সালের নভেম্বরে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রো চলাচল শুরু হয়। বর্তমানে মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত লাইনের কাজ দ্রুত এগিয়ে নিতে অস্থায়ী সিঁড়িসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে এবং সড়ক উন্নয়নের কাজও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ঢাকায় আরও দুই রুটে মেট্রোরেল, ব্যয় দুই লাখ কোটি টাকার বেশি।
