
একসময় চিকিৎসা, কেনাকাটা কিংবা নিছক ভ্রমণের প্রয়োজনে বাংলাদেশের হাজার হাজার নাগরিক নিয়মিত কলকাতার পাশাপাশি দিল্লি, চেন্নাই ও বেঙ্গালুরুর মতো বিভিন্ন শহরে পাড়ি দিতেন। বিশেষ করে কলকাতার হাসপাতাল এবং প্রধান শপিং মার্কেটগুলোতে বাংলাদেশি পর্যটকদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। কিন্তু সাম্প্রতিক সরকারি ও পর্যটন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সেই পরিচিত দৃশ্যে নজিরবিহীন ধস নেমেছে। গত এক বছরের ব্যবধানে ভারতে বাংলাদেশি পর্যটক আসার হার কমেছে প্রায় ৭৩ শতাংশ। ২০২৪ সালে যেখানে প্রায় ১৭ লাখ ৫০ হাজার বাংলাদেশি ভারতে এসেছিলেন, সেখানে ২০২৫-২৬ সময়ে সেই সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪ লাখ ৬৬ হাজারে।
হোটেল অগ্নিকাণ্ড ও নিরাপত্তার আতঙ্ক
যদিও ২০২৬ সালের পূর্ণাঙ্গ সরকারি পরিসংখ্যান এখনো প্রকাশিত হয়নি, তবে সাম্প্রতিক কিছু স্পর্শকাতর ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। গত ১৮ আগস্ট কলকাতার নিউ মার্কেট থানা এলাকার ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের (মির্জা গালিব স্ট্রিট) ‘শিখা ইন’ হোটেলে একটি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ওই দুর্ঘটনায় ৭ জন বাংলাদেশিসহ মোট ৯ জনের করুণ মৃত্যু হয়। এই অগ্নিকাণ্ডের পর বাংলাদেশি পর্যটকদের ভ্রমণ উদ্যোগে আরও বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এত সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে কেন বাংলাদেশি পর্যটকের আগমন এভাবে কমে গেল, তা নিয়ে পর্যটন খাতসংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতানুযায়ী, ভ্রমণার্থী কমার পেছনে একাধিক কারণ বিদ্যমান রয়েছে। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর কলকাতা পৌরসভা এলাকার বিতর্কিত হোটেলগুলো সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছিল। পরবর্তীতে কিছু হোটেল পুনরায় খুলে দেওয়া হলেও সাধারণ ভ্রমণার্থীদের মনে অগ্নিনিরোধক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে বড় ধরনের সংশয় ও উদ্বেগ রয়ে গেছে। ‘শিখা ইন’ হোটেলের ভয়াবহ স্মৃতি অনেকের মনে এখনো আতঙ্কের জন্ম দেয়, যা সীমান্ত পার হয়ে ভারতে যাওয়ার সিদ্ধান্তে বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।
ভিসা জটিলতা ও অর্থনৈতিক চাপ
ভ্রমণ কমার পেছনে অপর একটি প্রধান কারণ হলো ভিসা প্রাপ্তির জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতা। ভারতীয় ভিসার জন্য দীর্ঘ সময়ের অপেক্ষা, অত্যন্ত সীমিত অ্যাপয়েন্টমেন্ট স্লট এবং প্রশাসনিক কড়াকড়ির কারণে অনেক সাধারণ আবেদনকারী তাদের পূর্বনির্ধারিত ভ্রমণের সিদ্ধান্ত বাতিল করতে বাধ্য হয়েছেন। এর পাশাপাশি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, বৈদেশিক মুদ্রার তীব্র সংকট ও ডলার বিনিময় হার বৃদ্ধি সীমান্ত পেরিয়ে বিদেশ সফরের খরচ অনেকাংশে বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে অনেক মধ্যবিত্ত ও সাধারণ পরিবার ভ্রমণ স্থগিত রাখছেন।
একইসঙ্গে দুই দেশের মধ্যকার বিদ্যমান রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরিস্থিতি পর্যটন খাতে বড় ভূমিকা রাখছে। ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে সীমান্তে ও পর্যটন লেনদেনে কিছুটা অনিশ্চয়তা ও জটিলতা তৈরি হয়। এসব বাস্তবতায় বিকল্প পর্যটন গন্তব্যের জনপ্রিয়তা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। অনেক বাংলাদেশি ভ্রমণার্থী এখন ভারতের বিকল্প হিসেবে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও তুরস্কের মতো দেশের দিকে ঝুঁকছেন। দ্রুত ভিসা অনুমোদন ও তুলনামূলক সাশ্রয়ী ভ্রমণ প্যাকেজ থাকায় এসব দেশ পর্যটকদের বেশি আকর্ষণ করছে। সহজ ভিসা প্রক্রিয়া ও সাশ্রয়ী ট্যুর প্যাকেজ তাদের এসব দেশের প্রতি আগ্রহী করে তুলছে।
চিকিৎসাসেবার খরচ নিয়ে ক্ষোভ
কলকাতার বিভিন্ন সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে বাংলাদেশি রোগীদের থেকে চিকিৎসার নামে অতিরিক্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার খরচ আদায়ের মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে। চিকিৎসা সেবার এই চড়া মূল্যের কারণে অনেকে কলকাতায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত বদলাচ্ছেন। এ বিষয়ে বাংলাদেশের নাগরিক আবু বক্কর নিজের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে জানান, পায়ের চিকিৎসার জন্য তিনি কলকাতার মুকুন্দপুর এলাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে গিয়েছিলেন। কিন্তু কোনো প্রাথমিক ওষুধ না দিয়েই চিকিৎসা শুরুর পূর্বশর্ত হিসেবে তাকে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকার বিভিন্ন পরীক্ষা করানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়। অথচ অন্তত কয়েকদিনের জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ দেওয়া যেত।
আবু বক্কর আরও দাবি করেন, চিকিৎসকেরা সাময়িক স্বস্তির জন্য কোনো ওষুধ না লিখে শুরুতেই আকাশচুম্বী মূল্যের ল্যাব টেস্ট ধরিয়ে দেন। এতে তীব্র ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি কোনো চিকিৎসা না করিয়ে ওই দিনই ঢাকায় ফিরে আসেন। তিনি পরিষ্কার জানান, প্রয়োজনে তিনি থাইল্যান্ড কিংবা অন্য কোনো উন্নত দেশে গিয়ে চিকিৎসা নেবেন, কিন্তু চিকিৎসা করাতে আর ভারতে যাবেন না। এই ধরনের অসন্তোষ বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি রোগীর মানসিকতায় পরিবর্তন আনছে।
কলকাতার স্থানীয় ব্যবসায় প্রভাব ও ভারতীয়দের বিদেশযাত্রা
বাংলাদেশি পর্যটক ও রোগীর আগমন অস্বাভাবিক হ্রাস পাওয়ায় কলকাতার হোটেল, সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল, শপিং মার্কেট ও স্থানীয় ট্রাভেল এজেন্সিগুলো কঠিন আর্থিক সংকটে পড়েছে। এসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বাৎসরিক রাজস্ব ও আয় ব্যাপকভাবে কমে গেছে। দীর্ঘ সময় ধরে ভারতের মেডিকেল ট্যুরিজমের মূল গ্রাহক ভিত্তি ছিল বাংলাদেশের নাগরিকেরা। কলকাতা মার্কুইস স্ট্রিট ফ্রি স্কুল স্ট্রিট ওয়েলফেয়ার সোসাইটির প্রতিনিধি হায়দার আলী বলেন, শুধু বর্তমান সময় নয়, ভিসা জটিলতার কারণে বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমল থেকেই মূলত বাংলাদেশি পর্যটকদের আসা কমতে শুরু করে। পরবর্তীতে ‘শিখা ইন’ হোটেলের অগ্নিকাণ্ড সেই ধসকে আরও তরান্বিত করে। তবে তিনি আশা করেন, সীমান্ত ও দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগ স্বাভাবিক হলে ভবিষ্যতে এই পরিস্থিতি আবার ঘুরে দাঁড়াবে।
অন্যদিকে, ভারতীয় নাগরিকদের বিদেশে ভ্রমণের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র ফুটে উঠেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রায় ৩ কোটি ২৭ লাখের বেশি ভারতীয় নাগরিক পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করেছেন, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৬ শতাংশ বেশি। ভারতীয়দের কাছে ভ্রমণের জন্য থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালদ্বীপ ও নেপাল বেশ জনপ্রিয়। এসব দেশে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের সংখ্যা বৃদ্ধি, সহনশীল ভিসানীতি ও সাশ্রয়ী খরচের কারণে ভারতীয় পর্যটকদের বিদেশযাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে মেডিকেল এবং ট্যুরিস্ট ভিসা সচল করতে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। আগামী দিনে পর্যটকের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
