
শেরপুরের শেরপুরের ৮৮ বছর বয়সী বৃদ্ধ সাজু শেখের দীর্ঘদিনের জীবনসঙ্গী নূরজাহান বেগম (৮২) মারা গেছেন। রোববার দুপুরে নিজ বাড়িতে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। একই দিন বিকেলে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়েছে। প্রায় সাত দশক ধরে তাঁরা সুখ-দুঃখের সাথী হিসেবে জীবন অতিবাহিত করেছিলেন। স্থানীয় ইউপি সদস্য ইলিয়াস মিয়া ৮২ বছর বয়সী নূরজাহান বেগমের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। কিন্তু দীর্ঘদিনের অসুস্থতা কেড়ে নিল তাঁর জীবনসঙ্গীকে। এর পর থেকে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারতেন না তিনি।
দীর্ঘ ছয় বছর আগে পড়ে গিয়ে কোমর ভেঙে যাওয়ার পর থেকে শয্যাশায়ী ছিলেন নূরজাহান বেগম। বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক জটিলতায় তাঁর অবস্থার অবনতি ঘটেছিল। অভাবের সংসারে শয্যাশায়ী স্ত্রীকে নিয়মিত সেবা ও প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র দেওয়া সাজু শেখের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছিল। এর আগে নিজের সীমাবদ্ধতার মধ্যেও স্ত্রীকে পরম মমতায় আগলে রাখার চিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা অনেকের নজরে আসে। ওই ভিডিওতে অসুস্থ স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরে খাবারের জন্য আকুতি জানিয়েছিলেন সাজু শেখ, যা সচেতন মহলে ব্যাপক সাড়া ফেলে। পরিবার সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ছয় বছর আগে পড়ে গিয়ে কোমরের হাড় ভেঙে যায় নূরজাহানের। ধীরে ধীরে পুরোপুরি শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন।
এ ঘটনার পর বিভিন্ন ব্যক্তি, সামাজিক সংগঠন ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। শেরপুরের জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন জানান, পরিবারটির সহায়তায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া তাদের কর্মসংস্থানের জন্য একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাও প্রদান করা হয়। এছাড়া দেশ-বিদেশের অনেক সহৃদয়বান মানুষ তাদের বিপদে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর অসহায়ত্বের কথা জেনে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রশাসনের লোকজন।
এই দম্পতির তিন ছেলে ও তিন মেয়ের মধ্যে মেয়েরা আগে থেকেই বিবাহিত এবং মাঝেমধ্যে খোঁজ নিতেন। তবে ছেলেদের জীবনের গল্পটিও ছিল সংগ্রামী। একজন সন্তান করোনা মহামারির সময়ে নিখোঁজ হয়ে যান। অন্য ছেলে ঢাকায় রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন এবং বছরে দু-একবার বাড়িতে আসেন। স্থানীয়ভাবে বসবাসকারী ছোট ছেলে নূর ইসলাম দিনমজুরি ও ঠেলাগাড়ি চালিয়ে সংসার চালান। কয়েক বছর আগে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে তাঁর স্ত্রীর মৃত্যু হয় এবং এখন তিন মেয়েকে নিয়ে নিজের সংসার চালানোই তাঁর জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে।
দীর্ঘ ৭০ বছরের দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনের শেষ দিনগুলোতে অশেষ লড়াইয়ের মুখোমুখি হয়েছেন সাজু শেখ। প্রিয়তমা স্ত্রীকে হারানোর পর বৃদ্ধ বয়সে এখন সাজু শেখের ভবিষ্যৎ দিনগুলো একাকী কাটানো ও অনিশ্চয়তা নিয়ে পরিবার ও প্রতিবেশীদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। দীর্ঘ ৭০ বছরের দাম্পত্য জীবনে সুখ-দুঃখ, অভাব-অনটন আর সংগ্রামে একে অপরের সঙ্গী ছিলেন সাজু শেখ ও নূরজাহান বেগম।
