
কৃষকদের মাঝে সরকারি সার বিতরণের ডিলারশিপ প্রদান প্রক্রিয়ায় শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলায় ব্যাপক অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও আর্থিক লেনদেনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার ডিলার নিয়োগের জন্য ৮৯ জন আবেদন করলেও চূড়ান্ত ও অনুমোদিত তালিকায় স্থানীয় সংসদ সদস্যের সহোদর ভাই, ফুপাতো ভাই, উপজেলা বিএনপির আহ্বায়কের স্ত্রীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের নাম স্থান পেয়েছে। পাশাপাশি, একটি জুলাই আন্দোলনের সময়কার মামলার এজাহারভুক্ত আসামির নামও এই তালিকায় আসায় স্থানীয় পর্যায়ে তীব্র আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি অর্থের বিনিময়ে ডিলারশিপ দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন ক্ষমতাসীন দলের কয়েকজন নেতাও। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, যোগ্যতা ও নীতিমালার ভিত্তিতে ডিলার নির্বাচন হয়েছে, নাকি রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবই ছিল মূল বিবেচ্য। অনেকের দাবি, অর্থের কাছে দলের ত্যাগী ও যোগ্য নেতাকর্মীরা বঞ্চিত হয়েছেন। অন্যদিকে, মামলার বাদী ও নিহত সবুজের বড় ভাই মো. সাদ্দাম হোসেন আদালতে নারাজি দেওয়ার পর মামলাটি বর্তমানে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) তদন্ত করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এই সময়েও যদি তারাই অর্থের বিনিময়ে ডিলারশিপ পায়, সেটা দুঃখজনক।’। তাঁর এই মন্তব্যও নিয়োগপ্রক্রিয়ার রাজনৈতিক চরিত্র নিয়ে বিতর্কের প্রতিফলন হিসেবে আলোচনায় এসেছে। ডিলার নিয়োগের তালিকা ঘিরে অসন্তোষ শুধু বিরোধী বা বাদ পড়া আবেদনকারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; দলীয় নেতাদের একাংশও নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। যাঁকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তাঁর যোগ্যতা ও ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা কীভাবে যাচাই করা হয়েছে, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি। তার আর্থিক অবস্থাও ভালো না, ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতাও নেই।
উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি সূত্রে জানা যায়, সর্বমোট ৮৯ জন আবেদনকারীর মধ্য থেকে যাচাই-বাছাই শেষে ১১টি পদের বিপরীতে ৩২ জনের একটি সুপারিশ তালিকা জেলা কমিটির কাছে পাঠানো হয়েছিল। পরবর্তীতে মন্ত্রণালয় কর্তৃক এই তালিকা চূড়ান্ত করা হয়। তবে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা পরিচালনা করে আসা অভিজ্ঞ আবেদনকারীরা বাদ পড়ায় এই নিয়োগের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে স্থানীয় মহল। পরে মন্ত্রণালয় তালিকাটি অনুমোদন দেয়। তার ভাষ্য, ‘টেহা-পয়সা কম দিবার চাইছিলাম তো তাই আমাক দেয় নাই।
তালিকার বিতর্কিত নামগুলোর মধ্যে রয়েছে রাণীশিমুল ইউনিয়নের মেসার্স আলম ট্রেডার্স, যার পরিচালক মো. সিদ্দিকুর রহমান ছাত্র আন্দোলনে নিহত সবুজ হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি। বিগত সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ থাকলেও বর্তমানে তিনি জামিন বা অব্যাহতির দাবি করেছেন। তবে নিহতের পরিবার এবং ছাত্রদল নেতৃবৃন্দ এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। জেলা ছাত্রদলের সভাপতি মো. নাঈম হাসান উজ্জল এবং রাণীশিমুল ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি খন্দকার মো. আছলাম ইতিমধ্যে জেলা প্রশাসক ও কৃষি মন্ত্রণালয় বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। এ বিষয়ে রাণীশিমুল ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি খন্দকার মো. আছলাম গত ২৪ সেপ্টেম্বর জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক বরাবর সিদ্দিকুর রহমানের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দেন। একই বিষয়ে গত ৪ অক্টোবর কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর অভিযোগ করেন জেলা ছাত্রদলের সভাপতি মো. নাঈম হাসান উজ্জল। জেলা ছাত্রদলের সভাপতি মো. নাঈম হাসান উজ্জল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘দীর্ঘ ১৭ বছর জেল-জুলুম, নির্যাতন সহ্য করে অনেক ত্যাগী কর্মী পথে বসে গেছে। অন্যদিকে সিদ্দিকুর রহমানের মতো ফ্যাসিস্টরা টাকার কুমির হয়েছে। তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মীর মধ্যে আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে মনোনয়নবঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কায় চাপা ক্ষোভ থাকলেও তাঁরা মুখ খুলছেন না।
স্বজনপ্রীতির অভিযোগের তীর রয়েছে শেরপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. মাহমুদুল হক রুবেলের পরিবারের দিকেও। খড়িয়া কাজিরচর ইউনিয়নে ডিলারশিপ পাওয়া মেসার্স হক ব্রাদার্সের মালিক সংসদ সদস্যের ছোট ভাই। কুড়িকাহনিয়া ইউনিয়নে নির্মাণ ট্রেডার্সের লাইসেন্স পেয়েছেন সংসদ সদস্যের ফুপাতো ভাই ও ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. হেদায়েতুল ইসলাম। এছাড়া পৌরসভায় মেসার্স লিখি ট্রেডার্সের অনুকূলে লাইসেন্স পেয়েছেন উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মো. আব্দুর রহিম দুলালের স্ত্রী মাহমুদা আক্তার তারানা। কাকিলাকুড়া ইউনিয়নে জোবায়ের এন্টারপ্রাইজের মালিক হিসেবে ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মো. জোবায়ের হাসানের নাম রয়েছে। স্থানীয়ভাবে গুঞ্জন রয়েছে, উপজেলা বিএনপির এক শীর্ষ নেতা তাঁর নামে লাইসেন্স করিয়েছেন। অথচ অন্যরা ভাড়া করা গুদাম দেখিয়েও নিয়োগ পেয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, ‘আসলে আমার মাল-পানি নাই, লাইসেন্স হবো কিভাবে?’। আসলে সে তো চালাতে পারবে না, চালাবে উপজেলার আরেক নেতা।’।
নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে দলের ভেতর থেকেই প্রতিবাদের সুর শোনা গেছে। পৌর বিএনপির আহ্বায়ক মো. ফজলুল হক চৌধুরী সামাজিক মাধ্যমে জামায়াত বাদে সর্বদলীয় ডিলার নিয়োগ দেওয়ার বিষয়ে তীর্যক মন্তব্য করেছেন। সিংগাবরুণা ইউনিয়নের আবেদনকারী ও উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আবু রায়হান বাবুল সরাসরি অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তুলে গণমাধ্যমে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
অভিজ্ঞতা ও নিজস্ব গুদাম থাকার পরও বাদ পড়া আবেদনকারীদের মধ্যে শামসুল আরেফিন, গোশাইপুর ইউনিয়নের মো. জাকির হোসেন এবং কাকিলাকুড়া ইউনিয়নের মাহবুবুন্নবী ফজু হতাশা প্রকাশ করে বলেন যে নীতিমালা ও যোগ্যতার সঠিক মূল্যায়ন করা হয়নি।
সব অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও মনিটরিং কমিটির সদস্যসচিব মো. মাহমুদুল হাসান আকন্দ জানান যে নীতিমালা মেনে প্রতিটি ইউনিয়ন থেকে যাচাই-বাছাই করেই নাম প্রস্তাব করে জেলা কমিটিতে পাঠানো হয়েছিল। অন্যদিকে, উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনীষা আহমেদ দাবি করেন যে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার সাথেই কমিটির সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে এই সুপারিশগুলো করা হয়েছে।
