
একটি শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে বহুমুখী সম্পর্ক আরও নিবিড় করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত চার দিনের সরকারি সফরে রয়েছেন তিনি। এই সফরের মূল লক্ষ্য হলো দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্ব মজবুত করা, বাণিজ্য বাড়ানো এবং উন্নয়ন সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করা। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের আলোচনার মূল লক্ষ্য ছিল এই অংশীদারত্বকে বাংলাদেশের জনগণের জন্য বাস্তব ও দৃশ্যমান সুযোগে রূপান্তরিত করা।’।
জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত শীর্ষ বৈঠকের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে তারেক রহমান লিখেছেন, দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্ব ও কৌশলগত সম্পর্ককে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিতে এই সফর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি বৈঠকের ফলাফলকে অত্যন্ত ফলপ্রসূ বলে অভিহিত করেন। আলোচনায় গণতন্ত্র, আইনের শাসন এবং একটি শান্তিপূর্ণ ও স্থিতিশীল ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল গড়ার প্রতি দুই নেতার যৌথ অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত হয়েছে।
জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করতে জাপানের ‘পার্টনারশিপ ফর পাওয়ার এশিয়া’ উদ্যোগের আওতায় প্রায় ৩২ কোটি মার্কিন ডলার বা পাঁচ হাজার কোটি ইয়েন জরুরি সহায়তার সম্ভাবনা নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। এছাড়া আগামী পাঁচ বছরে জাপানের বেসরকারি খাতের মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রায় ৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ১ ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে কথা হয়েছে, যা প্রায় দুই লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে।
প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতার অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে একটি ‘বাংলাদেশ-জাপান টেক পার্ক’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছেন। এতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং, রোবোটিকস ও ইলেকট্রনিকস উৎপাদনের মতো আধুনিক প্রযুক্তি খাতে উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে। এছাড়া ছয়টি বড় বিভাগীয় শহরকে যুক্ত করার জন্য দ্রুতগতির রেল সংযোগ ও আধুনিক পরিবহন পরিকাঠামো উন্নয়নে জাপানের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী জানান, বঙ্গোপসাগর শিল্প প্রবৃদ্ধি বলয় বা ‘বিগ-বি’ উদ্যোগকে যৌথ সমৃদ্ধির নতুন কাঠামোর আওতায় আরও গতিশীল করতে উভয় পক্ষ সম্মত হয়েছে। এর মাধ্যমে জ্বালানি, গভীর সমুদ্রবন্দর এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, যা বাংলাদেশকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে পরিণত করবে।
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের আরও গভীরতা বাড়াতে বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি দুই দেশের অভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়মিত তদারকির জন্য একটি মন্ত্রী পর্যায়ের যৌথ কমিশন গঠনের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে জাপানের মানবিক সহায়তার প্রশংসা করে তারেক রহমান বলেন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায় ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে টোকিওর কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন। তিনি জানান, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে জাপান সবসময় বিশ্বস্ত উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে পাশে রয়েছে।
স্মৃতিচারণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দুই দেশের সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন এবং মা প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া বিভিন্ন সফরের মাধ্যমে সেই সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করেছিলেন। এই আতিথেয়তা ও আস্থার জন্য তিনি জাপানের সরকার ও জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
সফরের শেষ পর্যায়ে এসে তারেক রহমান জানান, গণতান্ত্রিক নির্বাচনের পর তার সরকার বিনিয়োগ, উদ্ভাবন ও অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে বদ্ধপরিকর। শীর্ষ বৈঠকের শেষে দুই নেতা যৌথ বিবৃতি প্রদান করেন এবং বেশ কয়েকটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন, যা ভবিষ্যতে দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক নির্বাচনের পর তাঁর সরকার বিনিয়োগ, উদ্ভাবন, অবকাঠামো উন্নয়ন ও অর্থপূর্ণ কর্মসংস্থানের সুযোগ দ্বারা চালিত একটি অর্থনীতি গড়ে তুলতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
