
রাঙামাটির সাজেক ভ্যালিতে স্থানীয় দুটি সংগঠনের ডাকা অনির্দিষ্টকালের অবরোধের মুখে আটকে পড়া ২ হাজার ৯৩৩ জন পর্যটক শেষ পর্যন্ত নিরাপত্তা বাহিনীর পাহারায় নিরাপদে খাগড়াছড়ি শহরে পৌঁছেছেন। ভয়ভীতির মধ্যেও ভালোভাবেই খাগড়াছড়িতে পৌঁছেছি। সকাল নয়টার দিকে সেনাবাহিনী ও পুলিশের পাহারায় তাঁদের গাড়িবহর সাজেক থেকে খাগড়াছড়ির উদ্দেশে রওনা হয়েছিল। এক বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠন দুটি জানায়, আজ থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য অবরোধ চলবে।
বৃহস্পতিবার বেলা একটার দিকে সেনাবাহিনীর কঠোর তত্ত্বাবধানে এই পর্যটকদের বহনকারী গাড়িগুলো গন্তব্যে পৌঁছায়।
তবে ফেরার পথে বাঘাইছড়ির উজো বাজার এলাকায় অবরোধকারীদের বাধার মুখে পড়েন তারা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে লাঠিপেটা করলে অবরোধকারীরা সেখান থেকে সরে যান। এরপর বেলা ১১টার দিকে পর্যটকবাহী বহরটি যাত্রা শুরু করে। এই ঘটনার পরপরই সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর গোলাগুলির ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছেন রাঙামাটির পুলিশ সুপার মুহম্মদ আব্দুর রকিব। পর্যটকেরা জানান, ফেরার পথে অবরোধকারীদের বাধা ও গোলাগুলির ঘটনায় আতঙ্কে ছিলেন।
অবরোধের কবলে পড়া পর্যটকরা চরম আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে সময় কাটিয়েছেন। ঢাকা থেকে পরিবারের আট সদস্য নিয়ে ঘুরতে যাওয়া আব্দুল মালেক জানান, বুধবার দুপুরে সাজেক পৌঁছানোর পর রাতে সড়ক অবরোধের খবর শোনেন। আজ ফেরার সময় গাড়ি আটকে রাখায় বেশ ভয় পেয়েছিলেন। শাপলা চত্বরে পৌঁছানোর পর কিছুটা স্বস্তি প্রকাশ করলেও বাড়ি ফেরার চিন্তা তাড়া করছে তাকে। একই পরিস্থিতির কথা জানিয়েছেন সাম্পারি গেস্টহাউসের কর্মী জুগেশ্বর ত্রিপুরা। উজো বাজারে গাড়ি আটকের পর নিরাপত্তা বাহিনীর হস্তক্ষেপেই তারা বের হয়ে আসতে পেরেছেন বলে জানান তিনি। সে অনুযায়ী শুক্রবার রাতে ঢাকা যাওয়ার টিকিট করেছি।
সাজেক থেকে ফিরে পর্যটকরা নতুন করে হোটেল সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন। মিজানুর রহমান নামে একজন জানান, শুক্রবার পর্যন্ত সাজেকে থাকার পরিকল্পনা ছিল তাদের, কিন্তু পরিস্থিতির কারণে দ্রুত ফিরতে হয়েছে। খাগড়াছড়ি শহরে এসে ভালো কোনো হোটেল কক্ষ খালি না পাওয়ায় পরিবার নিয়ে বিপাকে পড়েছেন তিনি। তবে পরিস্থিতি সার্বিক নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে দাবি করেছেন খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত। তিনি জানান, পর্যটকরা নিরাপদে ফিরেছেন এবং অনেকে ইতিমধ্যে এলাকা ছেড়েছেন। এখন খাগড়াছড়ি এসে শহরের দুইটি ভালো হোটেলে রুম খালি না থাকায় পরিবার–পরিজন নিয়ে কী করব বুঝতে পারছি না।’। অনেকে খাগড়াছড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছেন, অনেকে এখনো খাগড়াছড়িতে অবস্থান করছেন। তাই গতকালকের মধ্যে সাজেক থেকে সব পর্যটককে চলে আসার অনুরোধ করা হয়।
এই সংকটের সূত্রপাত হয় বুধবার সাজেক পর্যটন সড়কে তৃতীয় দফার অবরোধের ঘোষণার মধ্য দিয়ে। ‘সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি’ এবং ‘সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন’ এই অবরোধের ডাক দিয়েছিল। এর আগে ১৫ অক্টোবর থেকে দ্বিতীয় দফায় অবরোধ শুরু হয়েছিল। তাদের তিন দফা দাবির মূল বিষয় হলো সাজেক এলাকা থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস-সন্তু লারমা) সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়া। এর প্রেক্ষিতে নিরাপত্তার খাতিরে জেলা প্রশাসন পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সাজেক ভ্যালি পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে এবং পর্যটকদের দ্রুত এলাকা ছাড়ার নির্দেশনা দেয়। ১১ অক্টোবর একই দাবিতে অনির্দিষ্টকালের অবরোধের ডাক দিয়েছিলেন তাঁরা। তাঁরা সড়কের বিভিন্ন স্থানে টায়ার ও গাছের গুঁড়িতে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেন।
তবে জেএসএস কর্তৃপক্ষ এই অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছে। সংগঠনটির প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা দাবি করেন, সাজেকে সাধারণ মানুষের ওপর ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যদের নিপীড়নের বিষয়টি আড়াল করতেই তাদের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ তোলা হচ্ছে। রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা অস্থিরতার এই টানাপোড়েনে পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে জড়িতরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। সাজেক রিসোর্ট কটেজ মালিক সমিতির সহসাধারণ সম্পাদক মতিজয় ত্রিপুরা জানান, পর্যটকদের দ্রুত চলে আসায় বুকিং বাতিলের পাশাপাশি স্থানীয়রা নিত্যপণ্য ও কৃষিপণ্য সরবরাহে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। পুরো পরিস্থিতি এখন স্থানীয় প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনীর নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছে।
