
পরিসংখ্যানের হিসাব অনেক সময় আপাতদৃষ্টিতে সঠিক মনে হলেও বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে তার অমিল থাকতে পারে। এমন একটি বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতির নাম হলো ‘সিম্পসন’স প্যারাডক্স’। এই ঘটনায় দেখা যায়, ছোট ছোট উপাত্ত বা গ্রুপে যে প্রবণতা কাজ করে, সবগুলো উপাত্তকে একসঙ্গে যোগ করলে সেই প্রবণতা সম্পূর্ণ বিপরীত হয়ে যায়। কোনো গণিত বা হিসাবের ভুল ছাড়াই এমন অসামঞ্জস্য তৈরি হতে পারে, যা অনেক সময় আমাদের ভুল সিদ্ধান্তে নিয়ে যায়। এটাই সিম্পসন’স প্যারাডক্সের মূল কারণ: একই তথ্যকে আলাদা গ্রুপে দেখলে একধরনের ছবি পাওয়া যায়, আর সেই গ্রুপগুলোর অনুপাত বদলে একসঙ্গে দেখলে সম্পূর্ণ উল্টো ছবি দেখা যেতে পারে।
একটি উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি পরিষ্কার করা যাক। মনে করুন, দুটি হাসপাতাল এ এবং বি-তে জটিল অস্ত্রোপচার করা হয়। সার্বিক সফলতার হারের দিকে তাকালে দেখা যায়, হাসপাতাল এ-তে সফলতার হার ৯১.৫ শতাংশ, যেখানে বি-তে তা মাত্র ৭২.৭ শতাংশ। প্রথম দর্শনে মনে হতে পারে হাসপাতাল এ অনেক বেশি কার্যকর। কিন্তু যখন রোগীদের শারীরিক অবস্থার ভিত্তিতে ‘সহজ’ ও ‘গুরুতর’ এই দুই ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়, তখন পুরো চিত্রটি পাল্টে যায়। আসলে প্রতিটি ক্ষেত্রেই হাসপাতাল বি-এর সফলতার হার বেশি। ফলে শুধু সফলতার হার নয়, কোন ধরনের রোগী কতজন ছিল, সেটাও চূড়ান্ত সংখ্যাটিকে প্রভাবিত করেছে। উত্তরটা হলো, মোট হারের দিকে না তাকিয়ে নিজের কেসটা কোন ভাগে পড়ে, সেটা দেখো।
হাসপাতাল এ-এর পরিসংখ্যান
- সহজ কেস: ৯০০ জন রোগী, ৯৫ শতাংশ সফলতায় ৮৫৫ জন সুস্থ।
- গুরুতর কেস: ১০০ জন রোগী, ৬০ শতাংশ সফলতায় ৬০ জন সুস্থ।
- মোট ফলাফল: ১০০০ রোগীর মধ্যে ৯১৫ জন সফল, অর্থাৎ ৯১.৫ শতাংশ।
হাসপাতাল বি-এর পরিসংখ্যান
- সহজ কেস: ১০০ জন রোগী, ৯৭ শতাংশ সফলতায় ৯৭ জন সুস্থ।
- গুরুতর কেস: ৯০০ জন রোগী, ৭০ শতাংশ সফলতায় ৬৩০ জন সুস্থ।
- মোট ফলাফল: ১০০০ রোগীর মধ্যে ৭২৭ জন সফল, অর্থাৎ ৭২.৭ শতাংশ।
এখানে রহস্যটি লুকিয়ে আছে রোগীর সংক্রমণের প্রকৃতির মধ্যে। হাসপাতাল এ-তে আসা রোগীদের বড় একটি অংশ ছিল সহজ কেসের, অন্যদিকে হাসপাতাল বি-তে আসা অধিকাংশ রোগীই ছিল গুরুতর অসুস্থ। তাই পৃথকভাবে দেখলেও প্রতিটি ক্ষেত্রে হাসপাতাল বি এগিয়ে থাকা সত্ত্বেও, মোট গড় হিসাবে এ-কে বেশি সফল দেখাচ্ছে। রোগী হিসেবে চিকিৎসার স্থান নির্বাচনের ক্ষেত্রে মোট গড় হারের চেয়ে নিজের অসুস্থতার ধরন অনুযায়ী সফলতা দেখাই যুক্তিসঙ্গত। তাহলে পুরো হাসপাতালের হিসাবে A কীভাবে এগিয়ে গেল।
এই ধরনের পরিসংখ্যানগত গোলকধাঁধার ঘটনা কেবল চিকিৎসাক্ষেত্রেই নয়, বিভিন্ন সামাজিক পরিসরেও ঘটে। ১৯৭৩ সালে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলির স্নাতকোত্তর ভর্তির তথ্য বিশ্লেষণ করতে গিয়েও একই ধরনের অসংগতি পাওয়া গিয়েছিল। সেই সময় সার্বিক ভর্তির হার বিশ্লেষণ করে মনে হচ্ছিল, বিশ্ববিদ্যালয়ে পুরুষদের ভর্তির হার নারীদের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি, যা লিঙ্গবৈষম্যের ইঙ্গিত দেয়।
তবে বিভাগভিত্তিক তথ্য পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনার পর দেখা যায়, অধিকাংশ বিভাগেই নারীদের ভর্তির হার পুরুষদের সমান অথবা বেশি ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় হিসাবে এমন পার্থক্যের মূল কারণ ছিল আবেদনকারীদের পছন্দের বিভাগ। নারীরা তুলনামূলক বেশি প্রতিযোগিতাপূর্ণ বিভাগে বেশি আবেদন করেছিলেন, যেখানে সবার জন্যই ভর্তির হার ছিল কম। অন্যদিকে পুরুষরা এমন সব বিভাগে আবেদন করেছিলেন, যেখানে ভর্তির হার ছিল তুলনামূলকভাবে বেশি।
উপসংহারে বলা যায়, সিম্পসন’স প্যারাডক্স আমাদের শেখায় যে গড় সংখ্যা বা মোট হিসাব সবসময় সামগ্রিক সত্য উপস্থাপন করে না। কোনো তথ্য বা ডেটা বিশ্লেষণের সময় উপাত্তগুলোকে খণ্ডিতভাবে বা নির্দিষ্ট উপদলে ভাগ করে দেখাও অত্যন্ত জরুরি। গড় কখনো কখনো বাস্তবতাকে সহজ করে ফেলে, আবার কখনো সেই সরলতা প্রকৃত সত্যকে আড়াল করে দেয়। তাই পরিসংখ্যানের ওপর অন্ধভাবে নির্ভর না করে তার পেছনের গঠন বুঝতে চেষ্টা করা প্রয়োজন।
