
বিএনপি নেতৃত্বাধীন চার-দলীয় জোট সরকারের আমলে কার দুর্বলতায় তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর দিনভর তাণ্ডব চালানোর সুযোগ পেয়েছিল, সেই প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর কাকরাইলের ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশে (আইডিইবি) আয়োজিত ‘২৮ অক্টোবর পল্টন ট্রাজেডি দিবস’ উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তিনি এ প্রশ্ন রাখেন। আওয়ামী লীগ কখনো স্বাভাবিকভাবে বিদায় নিতে পারেনি।
সরকারের ভূমিকা নিয়ে সংশয়
শফিকুর রহমান বলেন, ‘তখনো তো চার-দলীয় সরকার ছিল। সারা দিনভর, মাগরিবের আগ পর্যন্ত তারা (আওয়ামী লীগ) তাণ্ডব চালানোর এই সুযোগ পেল কীভাবে? এখানে কার দুর্বলতা ছিল? আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সামনেই নির্মম হত্যাকাণ্ড হলো, তারা কাউকে একটু হাত ধরে সরিয়ে দেওয়ারও চেষ্টা করল না কেন? তাহলে এখানে কি অন্য কোনো বৃহৎ ষড়যন্ত্র এবং নোংরা খেলা ছিল? এটা জাতির কাছে এক বিরাট প্রশ্ন।’ এ দেশ কোনো ফ্যাসিবাদের হাতে ইজারা দেওয়া হবে না।
আওয়ামী লীগকে ফ্যাসিবাদী ক্লাবের আখ্যা
জামায়াতে ইসলামীর আমির বলেন, ‘আওয়ামী লীগ কোনো রাজনৈতিক দল নয়, এটা ফ্যাসিস্টদের একটা ক্লাব। এরা যখনই বিভিন্ন কায়দায় সন্ত্রাস করে ক্ষমতায় গিয়েছে, তখনই এরা বেপরোয়া হত্যাকাণ্ড ও সন্ত্রাস চালিয়ে নিজেদের গদি পাকাপোক্ত করতে চেয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশে তারা চেয়েছিল চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে।’ তিনি ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ডকে সন্ত্রাস, লুটপাট ও চাঁদাবাজির সঙ্গে তুলনা করেন। এ সময় প্রায় ১০ হাজার মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা করা হয়েছিল বলেও তিনি দাবি করেন। বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি থেকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সমান তালে সন্ত্রাস, লুটপাট, চাঁদাবাজি, নারীদের ইজ্জত নষ্ট করেছিল। তাদের অপকর্মের বোঝা এত ভারী হয়ে গিয়েছিল, তারা বুঝতে পেরেছিল, এ দেশের মানুষ ভবিষ্যতে তাদের সমর্থন দেবে না।
লগি-বৈঠা ও ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি
২০০৬ সালে চার-দলীয় জোট সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে লগি-বৈঠা নিয়ে ঢাকায় আসার নির্দেশ দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘রাজধানীর পিচঢালা রাস্তায় নৌকা চলে না।
এই লগি-বৈঠা আনা হয়েছিল মানুষ পিটিয়ে হত্যা করার জন্য। আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাদের দোসর বামপন্থীরাও এতে শরিক ছিল। জামায়াত নেতাদের মিথ্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পরিণাম আওয়ামী লীগকে ভোগ করতে হবে বলে তিনি হুঁশিয়ারি দেন। তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদীদের কেউ কেউ আশকারা দিচ্ছে, কিন্তু সাপ নিয়ে নাড়াচাড়া করবেন না; এই সাপই ছোবল দিয়ে শেষ করে দেবে। বর্তমান সরকারকে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করে জনগণের প্রত্যাশা পূরণের আহ্বানও জানান তিনি। সে রাস্তা এখন অন্য কেউ অবলম্বন করতে চাইলে তাদের পরিণতিও ভিন্ন হবে না।
অন্যান্য বক্তাদের বক্তব্য
- জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বিএনপি গণ-আকাঙ্ক্ষার অংশীজন হিসেবে নির্বাচনের আগে যে কথা দিয়েছিল, সেখান থেকে মুখ ফিরিয়ে ফ্যাসিবাদের পথে হাঁটতে শুরু করেছে।
- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (ডাকসু) ভিপি মো. আবু সাদিক (সাদিক কায়েম) এ সময় ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন।
- আলোচনা সভায় ২৮ অক্টোবরের ঘটনায় নিহত গোলাম কিবরিয়ার বাবা তাজুল ইসলাম, সাইফুল্লাহ মোহাম্মদ মাসুমের মা শামছুন নাহার, মুজাহিদুল ইসলামের মামা মিজান আহমেদ ও হাবিবুর রহমানের ছেলে রুবেল মৃধা বক্তব্য রাখেন।
- অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন জামায়াতের ঢাকা মহানগর উত্তরের সেক্রেটারি রেজাউল করিম ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সেক্রেটারি শফিকুল ইসলাম মাসুদ।
এছাড়া জামায়াতে ইসলামীর জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির এ টি এম আজহারুল ইসলাম, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান, আবদুল হালিম এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুলসহ শীর্ষ নেতারা সভায় উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা ২৮ অক্টোবরের ট্রাজেডির বিচার ও শহীদদের স্মরণে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান।
