
বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা কে এম তাহসিফ সাউরি হত্যা মামলায় রিমান্ডে থাকা আহমেদ শাহরিয়ার দীপ ও এক তরুণীকে মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদ করছে নৌ পুলিশ। আদালতের নির্দেশে চার দিনের রিমান্ডে থাকা এই দুজনকে নিয়ে তদন্তের নতুন মোড় উন্মোচনের চেষ্টা চলছে। নৌ পুলিশ সদর দপ্তরের গণমাধ্যম শাখার পুলিশ সুপার মাসুমা আক্তার জানিয়েছেন, জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যগুলো গুরুত্বের সাথে যাচাই করা হচ্ছে।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা যায়, ঘটনার দিন ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় উত্তরায় নিজেদের ভবনের নিচ থেকে তাহসিফ ও দীপ মোটরসাইকেলে করে বের হন। এরপর তাহসিফ ওই তরুণীকে নিয়ে উত্তরা ১৩ নম্বর সেক্টরের একটি বারে যান এবং সেখানে দীপও উপস্থিত ছিলেন। বারে থাকা অবস্থায় তাহসিফের সঙ্গে ওই তরুণীর মনোমালিন্য হয়। ঘণ্টাখানেক পর বার থেকে বেরিয়ে তাহসিফ ওই তরুণীকে তাঁর বাসার সামনে নামিয়ে দিয়ে আসেন। ঠিক কী ঘটেছিল এবং ওই সময় তাঁদের গতিবিধি কী ছিল, তা নিশ্চিত হতেই অভিযুক্ত দুজনকে মুখোমুখি বসিয়ে জেরা করছে পুলিশ। মামলার তদন্ত–সংশ্লিষ্ট সূত্র জানা যায়, বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরি গত ২৭ অক্টোবর উত্তরার ১৮ নম্বরের সেক্টরের তাঁদের ভবনের নিচ থেকে দীপের সঙ্গে মোটরসাইকেলে করে বের হন।
তাহসিফের মৃত্যু রহস্য উদ্ঘাটনে পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজসহ বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করছে। দীপের দাবি অনুযায়ী, ঘটনার রাতে টঙ্গীর তুরাগ নদের তীরে পুলিশের পোশাক পরিহিত দুজনকে দেখে ভয়ে তাহসিফ ও তিনি দুই দিকে দৌড়ে পালান। দীপ জানান, তিনি বিআইডব্লিউটিএ পিলারের কাছে লুকিয়ে ছিলেন এবং পরে টহল পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের মুখে তিনি তাহসিফের সঙ্গে আসার কথা জানালে তারা তাঁকে চলে যাওয়ার পরামর্শ দেয়। এরপর থেকে তাহসিফের সঙ্গে আর দেখা হয়নি বলে দাবি তাঁর। তবে ফোনের রেকর্ড বলছে, রাত ১টা ৩৫ মিনিটে তাহসিফ তাঁর মায়ের ফোনে ভয়েস বার্তা দিয়েছিলেন যে তিনি রওনা হয়েছেন। অপরদিকে, দীপ ১টা ৩৯ মিনিটে মোহাম্মদপুরে তাঁদের ভাড়া বাসার দারোয়ানকে ফোন করে দেরি হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন এবং রাত আড়াইটার দিকে বাসায় ফেরেন। দীপ তুরাগ নদের তীরে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) পিলারে কাছে গিয়ে লুকান। আমার ছেলের সাঁতারে প্রশিক্ষণ ছিল, ডুবে মৃত্যু হতে পারে না: তাহসিফের বাবা।
গত ২৭ অক্টোবর বাসা থেকে বের হওয়ার পরদিন বিকেলে তুরাগ নদ থেকে তাহসিফের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাঁর ব্যবহৃত আইফোন থেকে পরিচয় শনাক্তের পর সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনায় দীপকে শনাক্ত করা হয়। গত বৃহস্পতিবার তাঁকে হেফাজতে নেওয়ার পর টঙ্গীর মাজার বস্তি থেকে একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়, যা তাহসিফের বলে নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ। শুক্রবার রাতে তাঁকে নৌ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং তাহসিফের বাবা অজ্ঞাতনামাদের বিরুদ্ধে উত্তরখান থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার পর দীপকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে চার দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গত শনিবার মধ্যরাতে মিরপুর ১৪ থেকে ওই তরুণীকেও গ্রেপ্তার করে পুলিশ। আবার অনেকে টঙ্গীর মাজার রোড বস্তিতে ঘোরাঘুরি করা ভিডিও নৌ পুলিশকে দিয়েছে। মামলায় পরিবারের তরফে সুনির্দিষ্ট কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ না তুললেও ঘটনায় তাহসিফের সঙ্গে থেকে আলোচনায় আসা দীপকে ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
নিহত তাহসিফের বাবার দাবি, তাঁর ছেলে দক্ষ সাঁতারু ছিলেন, তাই ডুবে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। মামলার তদন্তে পরিবারের তরফ থেকে সরাসরি কারো নাম উল্লেখ না করা হলেও তদন্তসাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্বজনেরা। বর্তমানে রিমান্ডে থাকা দুজনকে নিয়ে তদন্তের পরবর্তী ধাপ নির্ধারণ করবে নৌ পুলিশ।
