
অধ্যয়ন ও নিয়মিত পড়াশোনাই একজন শিক্ষার্থীর প্রধান তপস্যা। জীবনের এই সময়ে বাড়তি পারিবারিক বা সামাজিক মানসিক চাপ না থাকায় নিবেদিত সাধনার মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞানই তাকে দেশের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে। তবে সম্প্রতি প্রকাশিত ২০২৬ সালের উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষার ফলাফলে যে সার্বিক চিত্রের প্রতিফলন ঘটেছে, তা দীর্ঘদিনের সেই প্রচলিত ধারণাকে ব্যাপকভাবে ধাক্কা দিয়েছে। গত ২২ বছরের মধ্যে উচ্চমাধ্যমিক স্তরে এমন ভয়াবহ পাসের হার ও মানগত অবনতি পুরো দেশকে হতবাক করেছে। ছোটবেলায় ছাত্রজীবন রচনা লেখার সময় সূচনা হিসেবে লিখেছিলাম, ‘ছাত্রানাং অধ্যয়নং তপঃ’—অর্থাৎ অধ্যয়নই (পড়াশোনা) ছাত্রদের তপস্যা। বিবিধ বিষয়ে জ্ঞান অর্জনের মোক্ষম সময় ছাত্রজীবন, কারণ এ সময়ে সাধারণত সাংসারিক ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে মানসিক চাপ থাকে না। সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এর মূল কারণ খুঁজে বের করতে হবে। এই ক্রান্তিলগ্নে ২০২৬ সালের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফল বিপর্যয় নতুন সংকটের জন্ম দিয়েছে।
দেশের ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের ফলাফলে দেখা গেছে, কেবল পাসের হারই কমেনি, বরং জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পেয়েছে। একই সঙ্গে শতভাগ পাস করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা যেমন কমেছে, তেমনি একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি—এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা অনেকটাই বেড়ে গেছে। এ বছর সারা দেশে মাত্র ৩৫ হাজার শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন, যেখানে আগের বছর এই সংখ্যা ছিল ৬৩ হাজার। ফলে জিপিএ-৫ না পাওয়ায় বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবেন। অভিভাবকেরা জানতে পারলে তো রক্ষা ছিল না।
এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন মোট প্রায় সাড়ে ১০ লাখ পরীক্ষার্থী। কিন্তু তাদের মধ্যে উত্তীর্ণ হতে পেরেছেন মাত্র ৫ লাখ ৪০ হাজার জন। অর্থাৎ পরীক্ষার খাতায় মোট পরীক্ষার্থীর প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থীই অকৃতকার্য হয়েছেন। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই পাবলিক পরীক্ষায় অর্ধেকের কাছাকাছি শিক্ষার্থীর ফেল করাকে সাধারণ কোনো ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। পরবর্তী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় এই ফল বিপর্যয়ের আসল কারণ গভীরভাবে অনুসন্ধান করে অবিলম্বে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। এককথায়, বিষয়টিকে উড়িয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এসব প্রশ্নের উত্তর গভীরভাবে অনুসন্ধান করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া সময়ের দাবি। এইচএসসি পরীক্ষা: ফেল করা মানেই জীবনযুদ্ধে হেরে যাওয়া নয়।
শিক্ষায় এমন ধসের পেছনে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, মানসম্মত পাঠদানের অভাব, শিক্ষকসংকট ও বৈরী আবহাওয়ার প্রভাব যেমন রয়েছে, তেমনি সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক নানা অনুষঙ্গও সমানভাবে দায়ী।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার রাজনৈতিক অভ্যুত্থানের পর অনেক কোমলমতি শিক্ষার্থী নানা ধরণের আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ে, যেখানে কোনো কোনো পক্ষ থেকে তাদের উৎসাহিতও করা হয়।
ফলে নিয়মিত পড়াশোনার স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হতে শুরু করে। এর পাশাপাশি যখন-তখন রাস্তায় নেমে আন্দোলন, লাগামহীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার এবং অপরিপক্ব বয়সে সার্বক্ষণিক মুঠোফোনে আসক্তি পড়াশোনা থেকে মনোযোগ সরিয়ে নিয়েছে। ফলে বাড়ছে মুঠোফোন-আসক্তি, আর পাল্লা দিয়ে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি।
একইভাবে অভিভাবকদের অসচেতনতায় কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার এবং প্রযুক্তিপণ্যের অপব্যবহার পুরো শিক্ষাব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের হাতেও যত্রতত্র স্মার্টফোন দেখা যায়, যা তাদের দৈনন্দিন জীবনে শারীরিক ও মানসিক ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। অনিয়ন্ত্রিত ফেসবুক ব্যবহার এবং সন্তানের যেকোনো আচরণকে অভিভাবকদের অন্ধভাবে প্রশ্রয় দেওয়ার প্রবণতা কিশোরদের বিভ্রান্তিকর পথে ঠেলে দিচ্ছে। সঠিক সময়ে তদারকি না করায় পড়াশোনা থেকে তাদের এই বিচ্ছিন্নতা উচ্চমাধ্যমিকের ফলে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এবং আগামীতে উচ্চশিক্ষার ভর্তিতেও এর মারাত্মক প্রভাব পড়বে।
ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ ও ইউনিভার্সেল নার্সিং কলেজ পরিচালনার নিজস্ব অভিজ্ঞতা থেকে ডা. আশীষ কুমার চক্রবর্ত্তী জানান, অনেক অভিভাবকের অনভিপ্রেত শৈথিল্য ও সন্তানকে সীমাতিরিক্ত সুবিধা দেওয়া শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক পড়াশোনার নিয়মকে নষ্ট করছে। অনেক সময় ছাত্র-ছাত্রীরা প্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিত থাকছে এবং অ্যাকাডেমিক কাজে অনীহা দেখাচ্ছে। এ বিষয়ে অভিভাবকদের সঙ্গে কর্তৃপক্ষ যোগাযোগ করলে ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার বদলে উল্টো সন্তানদের অছাত্রসুলভ আচরণের পক্ষে তারা যুক্তি দাঁড় করাচ্ছেন, যা পেশাগত শিক্ষা ও সফল ভবিষ্যতের জন্য চরম বাধা। প্রায়ই দেখা যাচ্ছে, শিক্ষার্থীরা ক্লাসে অনুপস্থিত থাকছে এবং অন্যান্য শিক্ষাকার্যক্রমে ব্যাপক অনাগ্রহ দেখাচ্ছে। এমনকি তাঁরা সন্তানের অছাত্রসুলভ আচরণের পক্ষেও অবস্থান নেন।
ঢাকার বাইরে প্রান্তিক পর্যায়ের শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকালেও একই হতাশাজনক চিত্র চোখে পড়ে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে নিজ পিতার স্মৃতিতে ডা. আশীষ কুমার চক্রবর্ত্তী বিগত ১৫ বছর ধরে ‘আশুতোষ চক্রবর্ত্তী স্মারক শিক্ষাবৃত্তি’ পরিচালনা করে আসছেন। সেখানকার স্থানীয় সেরা ১০ থেকে ১৫টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রথম স্থান অর্জনকারী ১০০ জন মেধাবী শিক্ষার্থীকে প্রতিবছর জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই বৃত্তি দেওয়া হয়। সরকার বা রাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ কর্তাব্যক্তিদের উপস্থিতিতে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে একটি বিশেষ স্মরণিকা প্রকাশ করা হয়। ১৫ বছর ধরে সেখানে আমার পিতার পুণ্য স্মৃতির উদ্দেশ্যে ‘আশুতোষ চক্রবর্ত্তী স্মারক শিক্ষাবৃত্তি’ প্রদান করে আসছি।
প্রকাশিত সেই স্মরণিকা সম্পাদনা করতে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন স্বনামধন্য স্কুলের প্রথম স্থান অর্জনকারী মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের অনেকে পরবর্তীতে জিপিএ-৫ পর্যন্ত পেতে ব্যর্থ হয়েছে। সেরা শিক্ষার্থীদের এমন দুর্বল ফলাফল প্রমাণ করে যে মাঠপর্যায়ে শিক্ষার গুণগত মান কতটা নিচে নেমে গেছে। শুধু আইনি কঠোরতা বা রাজনৈতিক সদিচ্ছার কথা বললেই শিক্ষাব্যবস্থার এই ক্রান্তিলগ্ন উৎরানো সম্ভব নয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির পাশাপাশি সামাজিক ও পারিবারিক তদারকির অভাব আজ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, স্মরণিকা সম্পাদনা করতে গিয়ে দেখেছি—কোনো কোনো স্কুলের প্রথম স্থান অধিকারী শিক্ষার্থীও জিপিএ-৫ পায়নি, যা উদ্বেগজনক।
পরীক্ষায় কাঙ্ক্ষিত ফল না পেয়ে অনেক সময় শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র হতাশা তৈরি হয়, যা ক্ষেত্রবিশেষে আত্মহত্যার মতো মর্মান্তিক পথ বেছে নেওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। তাই এই সংকট কাটাতে কেবল সরকারের মুখাপেক্ষী না থেকে প্রতিটি পরিবারকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। সন্তানকে পড়াশোনায় মনোযোগী করার পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধে গড়ে তোলার দায়িত্ব নিতে হবে বাবা-মাকেই। শেষ পর্যন্ত একটি আলোকিত ও উন্নত বাংলাদেশ গড়তে হলে সুশিক্ষিত ও মেধাবী মানুষের কোনো বিকল্প নেই। এর মধ্য দিয়ে অনেকের পড়াশোনায় ভাটা পড়তে শুরু করে।
