• প্রচ্ছদ
  • মতামত
  • বাংলাদেশে কেন রাজনীতির ভাষা এত আক্রমণাত্মক ও রুক্ষ?
  • বাংলাদেশে কেন রাজনীতির ভাষা এত আক্রমণাত্মক ও রুক্ষ?

    বাংলাদেশে রাজনীতির বর্তমান চিত্র যেন অনেকটা বক্সিং রিংয়ের মতো। রাজনৈতিক দলগুলোর একে অপরের ওপর চড়াও হওয়ার ভঙ্গি, বক্তব্য প্রদান এবং শব্দচয়নের ধরন যেমন উত্তেজনাকর, তেমনি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই আক্রমণাত্মক ভাষার উৎস শুধু বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণ নয়, বরং এর শিকড় গভীরভাবে প্রোথিত রয়েছে আমাদের ইতিহাসের ক্ষতচিহ্ন, দীর্ঘ ক্ষমতার প্রতিযোগিতা এবং মানুষের মনে জমে থাকা ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে। এখানে এক দল আরেক দলের ওপর যেভাবে চড়াও হয়, যেভাবে কথা বলে, যেভাবে বক্তৃতায় শব্দচয়ন হয়, তা উত্তেজনাকর তো বটেই, ভীতিকরও। ভাষার ভেতরে জমে ওঠে ক্রোধ, বিদ্বেষ, উপহাস, হুমকি ও প্রতিশোধের আগুন। শব্দের মধ্যে জমে ওঠে আত্মরক্ষার তাড়না।

    প্রকৃতিগতভাবে বাংলাদেশ যেন শান্ত ও কোমল মানুষের দেশ। শ্রাবণের বারিধারা বা নদীর মৃদু স্রোতধারার মতোই এ দেশের মানুষের স্বভাব। কিন্তু রাজনীতির মঞ্চে উঠলেই কেন এই কোমলতা বদলে গিয়ে লোহার মতো কঠিন ভাষায় রূপ নেয়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে দেশভাগের ক্ষত, ভাষা আন্দোলন, গণ-অভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ ও সামরিক শাসনের মতো ইতিহাসের ঘটনাবহুল পথ ধরে এগোতে হয়। প্রতিটি রাজনৈতিক পালাবদল এবং আদর্শিক সংঘাত এই জাতির মনে গভীর দাগ কেটেছে, যার ফলে রাজনীতি এখানে কেবল মতাদর্শিক লড়াই নয়, বরং অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের আকাশে যখন সন্ধ্যার শেষ শালিকটি উড়ে যায়, যখন ধানের খেতের ওপর নিঃশব্দ কুয়াশা নেমে আসে, তখন মনে হয় এ দেশ যেন মূলত কোমল মানুষের দেশ। নদীর স্রোতের মতো শান্ত, শাপলার পাপড়ির মতো নরম কিংবা শ্রাবণের বৃষ্টির মতো উদার। যে জনগোষ্ঠী রবীন্দ্রনাথের গান গায়, জীবনানন্দের ধানসিঁড়ি খুঁজে বেড়ায়, তারাই আবার রাজনীতির ভাষায় কেন এত নির্মম। তারুণ্যের বিদ্রোহে বিশ্ব কেন উত্তাল।

    একটি জাতি যখন দীর্ঘ সময় সংকটের মধ্য দিয়ে টিকে থাকে, তখন তার ভাষায় মসৃণতা বজায় থাকা কঠিন। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষকে এখন আর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হয় না, বরং তাদের জাতির সর্বনাশের কারণ হিসেবে গণ্য করা হয়। বিতর্কের চেয়ে নিন্দা, তর্কের চেয়ে ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং যুক্তির চেয়ে তাচ্ছিল্য এখন রাজনীতির প্রধান হাতিয়ার। গ্রামে যেমন মতপার্থক্যের পরও কৃষকেরা মিলেমিশে আড্ডা দিতে পারে, রাজনীতির সেই সহজ ও হৃদ্যতাপূর্ণ পরিবেশ আজ অনেকটাই বিলীন। এই ভূখণ্ডের জন্মই হয়েছে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে।

    রাজনৈতিক নেতৃত্বের পাশাপাশি সমাজও এই রূঢ় সংস্কৃতিকে পরোক্ষভাবে প্রশ্রয় দিচ্ছে। ব্যক্তিগত আড্ডা থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা ভিন্নমতকে সহ্য করতে পারছি না। নিজেদের মতামতকে একমাত্র সত্য প্রমাণ করার প্রবণতা এবং উত্তেজনাকর বক্তব্যের প্রতি মানুষের আগ্রহ দেখে নেতারাও পরিমিত ভাষার চেয়ে উস্কানিমূলক শব্দ ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছেন। ক্ষমতার নিরাপত্তা এবং অস্তিত্ব হারানোর ভয়ে অনেক নেতা আক্রমণাত্মক ভাষার আড়ালে নিজের দুর্বলতা ঢাকার চেষ্টা করেন।

    ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোও এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। মুঠোফোনের প্রতিটি স্ক্রিন এখন একেকটি মঞ্চ, যেখানে ক্রোধের প্রকাশ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিটি ফেসবুক পোস্ট বা মন্তব্য নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি করে। মানুষ এখন আর দীর্ঘ ও জটিল বিষয়ের চেয়ে সহজ উত্তরের খোঁজে থাকে। আর জটিল রাজনৈতিক বা সামাজিক বাস্তবতা ব্যাখ্যা করার চেয়ে শত্রু চিহ্নিত করা সহজ; এক্ষেত্রে একটি স্লোগান বা অভিযোগই যথেষ্ট।

    দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংঘাত এবং ক্ষমতার হিসাব-নিকাশে সাধারণ মানুষের আবেগ ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। দেশের কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষার্থী বা রিকশাচালক—যাঁরা প্রতিদিন জীবনযুদ্ধে লিপ্ত, তাঁদের ভাষায় বিদ্বেষের চেয়ে বরং বেঁচে থাকার আকুতি ও ভবিষ্যতের স্বপ্ন বেশি থাকে। অথচ রাজনৈতিক মঞ্চে যে ভাষার জন্ম হয়, তা মূলত ক্ষমতার হিসাবের ভাষা।

    তবে ভাষা বা রাজনৈতিক সংস্কৃতি কোনো স্থির বিষয় নয়।

    নদী যেমন গতিপথ পরিবর্তন করে, ভাষাও বিবর্তিত হতে পারে।

    যেদিন রাজনৈতিক নেতৃত্ব বুঝতে পারবে যে আক্রমণাত্মক ভাষা সাময়িকভাবে হাততালি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে সমাজকে ক্লান্ত করে তোলে, সেদিনই পরিবর্তনের সূচনা হবে।

    পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভিন্নমতকে ধারণ করার মানসিকতা তৈরি হলেই এই উত্তেজনার অবসান সম্ভব।

    বাংলাদেশের প্রকৃতি যেমন স্নিগ্ধ ও সুন্দর, সেই স্বাভাবিকতায় রাজনীতিও একদিন হয়তো সহনশীলতার পথে ফিরে আসবে। দিনশেষে, সবচেয়ে শক্তিশালী শব্দ সেটিই নয় যা প্রতিপক্ষকে বিদ্ধ করে, বরং সেটি যা বিভক্ত মানুষকে একটি টেবিলে বসতে শেখায়।

    আরও পড়ুন

    শতবর্ষী মতলব বাজার আজ অবহেলার সংকটে! আধুনিক শপিং কমপ্লেক্স গড়ে উঠলেও বদলায়নি প্রাচীন রাস্তা-গলি, হারিয়ে যাচ্ছে ইতিহাসের সাক্ষী ঘাট-খাল
    সরকার ফাউন্ডেশন এর অভিষেক ও মরহুম ফখরুল ইসলাম সরকার স্মরণে আলোচনা ও শীত বস্ত্র বিতরণ
    মেডিকেল টেকনোলজিস্ট সাইফুল হত্যার বিচার দাবিতে কালিগঞ্জে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত”
    চাঁদপুর জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতৃবৃন্দকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান রুবাইত আহমেদ উৎস
    প্রধানমন্ত্রীর দেশ পরিচালনা নিয়ে প্রকাশ হচ্ছে বই
    সন্তানের মনের খবর জানতে বন্ধু হবেন যেভাবে