
শারদীয় দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির চিত্র বিশ্বের সামনে তুলে ধরার ওপর জোর দিয়েছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। সোমবার চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে জেলা প্রশাসনের আয়োজনে শারদীয় দুর্গাপূজার নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলাবিষয়ক প্রস্তুতিমূলক সভায় তিনি এ আহ্বান জানান। জেলা প্রশাসক বলেন, দেশের প্রতিটি নাগরিক ও সম্প্রদায়ের মানুষ এখানে নিরাপদে বসবাস করেন এবং নির্বিঘ্নে তাদের ধর্মীয় উৎসব পালন করেন—এই বার্তাই বিশ্বকে পৌঁছে দিতে হবে।
প্রস্তুতিমূলক সভায় জেলা প্রশাসক জানান, ছোট কোনো ঘটনাকে কেন্দ্র করে কোনো গোষ্ঠী যাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার চালিয়ে উৎসবকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে না পারে, সে বিষয়ে সকলকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। গুজব ও অপতথ্য মোকাবিলায় জেলা প্রশাসনের সাইবার ইউনিট সক্রিয় থাকবে। একই সাথে গুজব ছড়িয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির যেকোনো অপচেষ্টা কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে বলে সভায় জানানো হয়।
সভায় উপস্থিত পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম জানান, মহানগরের বাইরের চট্টগ্রাম জেলায় স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলে মোট ২ হাজার ২৮৭টি পূজামণ্ডপ রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৮০০টি মণ্ডপের প্রতিমা বিসর্জনের পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি স্পষ্ট করেন যে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়ানোর কোনো তৎপরতা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সহ্য করবে না। পূজা কমিটিগুলোকে বিভ্রান্তিকর তথ্য থেকে সাবধান থাকতে এবং দ্রুত সঠিক তথ্য প্রচারের পরামর্শ দেন তিনি।
নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে জেলা প্রশাসক প্রতিটি মণ্ডপে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং স্বেচ্ছাসেবকদের দায়িত্ব বণ্টনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। স্বেচ্ছাসেবকদের আলাদা পোশাক, কটি বা আর্মব্যান্ড ব্যবহারের মাধ্যমে সহজে শনাক্ত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে স্বেচ্ছাসেবকদের তালিকা ও মোবাইল নম্বর স্ব-স্ব থানায় জমা দিতে পূজা কমিটির নেতাদের প্রতি আহ্বান জানান পুলিশ সুপার। মণ্ডপ সংক্রান্ত কোনো বিরোধ থাকলে তা দ্রুত স্থানীয় পর্যায়ে মীমাংসারও পরামর্শ দেওয়া হয়।
প্রতিমা তৈরি থেকে শুরু করে পরিবহন এবং বিসর্জন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপেই নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন জেলা প্রশাসক। বিসর্জনস্থলে পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা নিশ্চিত করা এবং যাতায়াত ব্যবস্থার সুবিধার্থে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সম্ভব হলে দিনের আলোতে প্রতিমা মণ্ডপে আনা এবং সূর্যাস্তের আগেই বিসর্জন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে সভায়। এছাড়া বিসর্জনে ব্যবহৃত যানবাহনের ফিটনেস এবং চালকের শারীরিক সক্ষমতা যাচাইয়ের তাগিদ দেওয়া হয়।
জেলা প্রশাসক বলেন, ‘আমরা চাই না এই উৎসবের আনন্দ বিষাদে রূপ নিক। সব কিছু আনন্দমুখর পরিবেশে সম্পন্ন করাই আমাদের লক্ষ্য।’ দুর্গোৎসবের ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও ঐতিহ্য ধরে রাখার পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মের কাছে উৎসবের সংস্কৃতি তুলে ধরার ওপরও জোর দেন তিনি। তিনি বলেন, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও উদারতার মাধ্যমেই সম্প্রীতির পরিবেশকে আরও সুদৃঢ় করতে হবে। আমাদের মানসিকতার বড় পরিসর দরকার, যা দেখে আগামী প্রজন্ম শিক্ষা গ্রহণ করতে পারবে। জেলা প্রশাসক গুজব ও অপপ্রচারকে দুর্গোৎসবের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন। আমরা যদি মনটাকে বড় করতে না পারি, তাহলে আমাদের পরের প্রজন্ম কী শিখবে?’।
সভায় জেলা প্রশাসন ও পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদ এবং হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গাপূজা উদযাপনে সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরণের সহায়তার নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে।
