
পান বাংলাদেশের গ্রামীণ সংস্কৃতির অন্যতম অংশ। ভোজনরসিকদের কাছে পান খাওয়ার পূর্ণতা আসে বিশেষ করে সুপারি ও চুনের সমন্বয়ে। চুন সাধারণত পাথর বা ঝিনুক থেকে উৎপাদিত হলেও ঝিনুকের খোসা থেকে তৈরি চুনের কদর ও স্বাদ অনেক বেশি। দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার শিবনগর ইউনিয়নের রাজারামপুর চুনিয়াপাড়া গ্রামে শত বছর ধরে ঝিনুক পুড়িয়ে চুন তৈরির সনাতনী পদ্ধতি এখনো টিকে রয়েছে। এই গ্রামটির নামই হয়েছে চুন তৈরির পেশাজীবীদের নামানুসারে। স্থানীয়দের আয়ের প্রধান উৎস হিসেবে এই শিল্পটি দীর্ঘকাল ধরে টিকে থাকলেও বর্তমান প্রতিকূলতায় তা বিলুপ্তির পথে। গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী মুখরোচক খাবার হলো পান। ভোজন রসিকদের ভোজন শেষে তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে পানের বিকল্প নেই। আপ্যায়নে আর যা-ই থাকুক, খাবার শেষে পান থাকা চা-ই চাই। তাদের পরিচয়েই এই গ্রামের নাম চুনিয়াপাড়া হয়েছে।
একসময় নদী-নালা ও জলাশয়ে ঝিনুকের প্রাচুর্য থাকায় কাঁচামাল সংগ্রহ করা ছিল সহজ। তখন স্বল্প খরচে চুন উৎপাদন করে কারিগরদের জীবন ভালোভাবেই কেটে যেত। কিন্তু বর্তমানে খাল-বিল ও জলাশয় ভরাট হয়ে যাওয়ায় আগের মতো ঝিনুক পাওয়া যায় না। চুন কারিগর নেপাল চন্দ্র দেবনাথের মতে, ঝিনুক সংকটের পাশাপাশি জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও শ্রমের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় চুন তৈরির উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়েছে। এসব সংকটের কারণে অনেক পরিবার দীর্ঘদিনের এই পেশা ছেড়ে অন্য জীবিকায় জড়িয়ে পড়েছেন। রাজারামপুর চুনিয়াপাড়া গ্রামে শতাধিক পরিবারের বসতি থাকলেও বর্তমানে মাত্র ৮টি পরিবার কোনোমতে এই ঐতিহ্য আঁকড়ে ধরে আছে। জলাশয়ের কমে যাওয়ায় ঝিনুকের সংকট, জ্বালানি ও মজুরির দাম বৃদ্ধির ফলে অনেকে এই পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় যুক্ত হয়েছেন। যে কয়েকটি পরিবার এখনও সংগ্রাম করছেন তাদের অবস্থাও করুণ।
পেশার সঙ্গে জড়িত বিমল চন্দ্র দেবনাথ ও তার স্ত্রী গীতা রানী দেবনাথ জানালেন, অভাবের তাড়না থাকলেও বংশপরম্পরায় চলে আসা এই শিল্পকে তারা এখনো ধরে রেখেছেন। কষ্টসাধ্য হলেও এটিই তাদের একমাত্র অবলম্বন। সরেজমিনে দেখা যায়, পরিবারের নারী ও পুরুষরা সবাই ঝিনুক সংগ্রহ, রৌদ্রে শুকানো ও মাটির চুল্লিতে বিশেষ প্রক্রিয়ায় পোড়ানোর কাজে ব্যস্ত। এই প্রক্রিয়ায় একজন কারিগর প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৭ থেকে ৮ কেজি চুন তৈরি করতে পারেন। এভাবে উৎপাদিত চুন স্থানীয় বাজারসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় খুচরা ও পাইকারি দরে বিক্রি করা হয়, যার বেশ চাহিদা রয়েছে। তাদের মতে, আগুনে পুড়ে ঝিনুক থেকে চুন হলেও সংসারে অভাবের আগুন যেন নিভতে চায় না।
শিবনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছামেদুল ইসলাম বলেন, চুনিয়াপাড়ার বাসিন্দারা বংশপরম্পরায় চুন তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। তাদের এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে এবং কারিগরদের জীবনমান উন্নয়নে উন্নত প্রশিক্ষণ ও সহজ শর্তে ক্ষুদ্র ঋণ সহায়তার বিষয়ে উপজেলা পরিষদের আগামী সভায় আলোচনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, রাজারামপুর চুনিয়াপাড়ার এই কুটিরশিল্পটি কেবল একটি পেশা নয়, এটি একটি ঐতিহ্য। তবে কাঁচামালের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা এবং সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না পেলে একসময় চিরতরে হারিয়ে যাবে ঝিনুক থেকে চুন তৈরির এই সনাতনী কুটিরশিল্প। প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা ও আধুনিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা গেলে পরিবারগুলো তাদের শত বছরের এই পেশা রক্ষা করে আরও বড় পরিসরে কাজ করার সুযোগ পাবে।
