
বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক আইনের শাসন সুসংহত করা এবং যুদ্ধাপরাধের বিচার নিশ্চিত করার লড়াইয়ে অনন্য ভূমিকা রাখায় ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার প্রখ্যাত মানবাধিকার আইনজীবী ও বিচারপতি নাভানেথাম নাভি পিল্লাই। শুক্রবার নরওয়ের রাজধানী অসলোতে আনুষ্ঠানিকভাবে ১২৫তম এই শান্তি পুরস্কার বিজয়ী হিসেবে তার নাম ঘোষণা করেছে নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি। কমিটির বিবৃতিতে তার সাহস ও নৈতিকতার ভূয়সী প্রশংসা করা হয়েছে। আলফ্রেড নোবেলের ইচ্ছাপত্রের আদর্শ অনুযায়ী আন্তর্জাতিক ভ্রাতৃত্ববোধ বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক আদালতের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে তার ভূমিকা শান্তিকামী মানুষের কাছে আজীবন চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে এক ভারতীয় তামিল পরিবারে বেড়ে ওঠা নাভি পিল্লাইয়ের কর্মজীবন বর্ণাঢ্য। বর্ণবাদী শাসনের সময় নেলসন ম্যান্ডেলার মতো নেতাদের আইনি সহায়তাকারী হিসেবে তার যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তীতে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্টের বিচারক, রুয়ান্ডা বিষয়ক আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটিআর) এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) বিচারক হিসেবে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। এর পাশাপাশি তিনি জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবেও বৈশ্বিক পর্যায়ে কাজ করেছেন। বর্ণবাদবিরোধী অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলাসহ অধিকারকর্মীদের পক্ষে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে তার যে সংগ্রামের সূচনা হয়েছিল, পরবর্তীতে তা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিস্তৃত হয়।
বিচারিক জীবনে পিল্লাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু নজির সৃষ্টি করেছেন। বিশেষ করে রুয়ান্ডা ট্রাইব্যুনালের বিচারক থাকাকালে ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতাকে মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গণহত্যার উপাদান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পেছনে তার অবদান অনস্বীকার্য। এছাড়া ঘৃণ্য অপপ্রচারের মাধ্যমে গণহত্যার উসকানি দেওয়ার অপরাধে কাউকে অভিযুক্ত করার ক্ষেত্রেও তিনি আইনি ইতিহাসে মাইলফলক স্থাপন করেছেন। তার এই সাহসী অবস্থান বিশ্বব্যাপী নির্যাতিত মানুষের জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। বিশ্বের নানা প্রান্তে ঘটে যাওয়া যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গণহত্যার মতো গুরুতর অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের মুখোমুখি করতে তিনি যুগান্তকারী ভূমিকা রেখেছেন।
সাম্প্রতিক দায়িত্বগুলোর মধ্যে তিনি অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড বিষয়ক জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের প্রধান হিসেবে কাজ করেছেন। বর্তমানে তিনি আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে পরিচালিত গণহত্যার মামলার বিচারক হিসেবে দায়িত্বরত রয়েছেন। নোবেল কমিটি মনে করে, বর্তমান সময়ে বিশ্ব যখন অস্থিরতা ও আইনি চাপের মুখে রয়েছে, তখন পিল্লাইয়ের মতো ব্যক্তিত্বদের আপসহীন অবস্থান আন্তর্জাতিক ভ্রাতৃত্ব ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করবে। নোবেল কমিটি উল্লেখ করে, বর্তমানে বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও আইনি ব্যবস্থা নজিরবিহীন চাপের মুখে পড়েছে এবং শক্তির জোরে আইনকে পাশ কাটানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
