
দিল্লিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং ভোটার তালিকা পুনর্বিবেচনা প্রক্রিয়ার দাবিতে চলমান বিক্ষোভের সময় আটক হওয়া একাধিক শিক্ষার্থী ও বিক্ষোভকারী পুলিশের বিরুদ্ধে গুরুতর নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছেন। তারা জানিয়েছেন, আটকের পর পুলিশি হেফাজতে তাদের মারধর করা হয়েছে এবং বিভিন্নভাবে হেনস্তা করা হয়েছে। এদের মধ্যে কয়েকজন বিক্ষোভকারী শরীরে আঘাতের চিহ্নও দেখিয়েছেন। তবে সবকিছুর পরও তাদের দাবি, যতক্ষণ না পর্যন্ত জবাবদিহি নিশ্চিত হচ্ছে, এই আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। আটক হওয়া শিক্ষার্থী ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেছে। তার চুল টানা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন এই শিক্ষার্থী। বাসে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস ঢুকছিল না বলেও তার অভিযোগ।
আটক ও হেনস্থার অভিজ্ঞতা
- শরণ্যা শর্মা: এসএফআই সদস্য ও আম্বেদকর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তিনি অভিযোগ করেছেন, ১১ অক্টোবর আটকের সময় পুলিশকর্মীরা তাকে ধাক্কা মেরে বাসে তোলেন এবং নারী পুলিশকর্মীরা তার পোশাক টেনে ধরে অপমান করার চেষ্টা করেন।
- নাদিয়া: এসএফআইয়ের দিল্লি সভাপতি এবং ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের ছাত্রী। তাকে ১০ অক্টোবর আটক করা হয়। তার অভিযোগ, পুলিশ ফোন কেড়ে নিতে চাইলে বাধা দেওয়ায় তাকে মারধর করা হয়, চিমটি কাটা হয় এবং তার গলা টিপে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
- নোভেল: ১০ অক্টোবরের বিক্ষোভে অংশ নেওয়া পিএইচডি শিক্ষার্থী। তিনি জানিয়েছেন, তাকে সাধারণ একটি দিল্লি ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশনের বাসে তিন ঘণ্টা বসিয়ে রেখে ক্রমাগত চড় মারা হয়েছে।
- অর্জুন: ১১ অক্টোবর আটক হওয়া সমাজকর্মী। তার দাবি, পুলিশের প্রিজন ভ্যানে থাকা অবস্থায় তাকে বুকে ও যৌনাঙ্গে লাথি মারা হয় এবং পোশাক ছিঁড়ে ফেলা হয়।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের ভাষ্যমতে, আটক কেন্দ্রে খাবার, পানি বা শৌচাগারের মতো ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধার অভাব ছিল। নাদিয়া জানিয়েছেন, পুলিশকর্মীরা তাদের বাসে আটকে রেখে মানসিকভাবে ভয় দেখাচ্ছিলেন যে তারা আর বাড়িতে ফিরতে পারবেন না। নোভেল জানিয়েছেন, তিনি পিএইচডি গবেষক এবং শিক্ষকতা পেশার কথা জানালেও পুলিশ তার ওপর অমানবিক আচরণ থামায়নি। অর্জুনের অভিযোগ অনুযায়ী, পুলিশ এমনভাবে আঘাত করছিল যাতে শরীরে দীর্ঘমেয়াদী স্পষ্ট দাগ না থাকে, তবে তাদের মধ্যে কয়েকজন নাবালকের হাড় ভেঙে যাওয়ার মতো জখমও হয়েছে। পুরুষ কমান্ডোরা জোর করে তাকে বাসে তুলছিলেন। তিনি বলেন, ‘একজন নারী পুলিশকর্মী আমার টি-শার্ট টেনে মাথার ওপরে তুলে দিয়েছিল। ওই বাসে চার-পাঁচটা ছোট খোপ করা ছিল।
দিল্লি পুলিশ গত ১০ অক্টোবর যন্তর-মন্তরে বিক্ষোভের অনুমতি দেয়নি। এর পাশাপাশি ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার (বিএনএসএস) ১৬৩ ধারা জারি করা হয়েছিল। যুগ্ম কমিশনার নূপুর প্রসাদ গত শুক্রবার জানিয়েছেন, জননিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার খাতিরেই এই বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে এবং আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এদিকে, এই পুরো অভিযোগের প্রেক্ষিতে দিল্লি পুলিশের বক্তব্য জানতে চাওয়া হলে তারা কোনো মন্তব্য করেনি। তাদের অভিযোগের ব্যাপারে দিল্লি পুলিশের বক্তব্যও জানতে চেয়েছিল।
বিক্ষোভের ঘটনাপ্রবাহ ও আইনি দিক
- বিক্ষোভের সময়সীমা: ২ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন ১০ অক্টোবর তীব্র আকার ধারণ করে।
- সাংবাদিকদের আটক: কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) জানিয়েছে, বিক্ষোভ কভার করার সময় দিল্লি, আহমেদাবাদ ও পুনে থেকে ৩৭ জন সাংবাদিককে আটক করা হয়েছিল, যার মধ্যে ৩৫ জনেরও বেশি দিল্লির সাংবাদিক।
- সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ: ১১ অক্টোবর ভারতের সর্বোচ্চ আদালত মন্তব্য করে যে, কোনো শান্তিপূর্ণ ও নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীকে বেআইনিভাবে আটক করা যায় না এবং কাউকে আটক করতে হলে আইনত নির্ধারিত প্রক্রিয়া মেনে চলতে হবে।
দিল্লিতে এখনো বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। যারা আটক হয়েছিলেন, তাদের অনেকে মানসিক ধকল কাটিয়ে ওঠার পাশাপাশি পুনরায় আন্দোলনের মাঠে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আটক হওয়া শিক্ষার্থীদের দাবি, পুলিশ যে ধরনের সহিংসতা চালিয়েছে, তা কেবল ভীতি সঞ্চারের উদ্দেশ্যে করা হয়েছে। আম্বেদকর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর ছাত্রী ও স্টুডেন্টস ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ার (এসএফআই) সদস্য শরণ্যা শর্মাকে ১১ অক্টোবরের বিক্ষোভ চলাকালীন আটক করা হয়।
