
বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার সরকারের অনুসৃত পথেই হাঁটছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি অভিযোগ করেন যে, এই সরকার জনমতের প্রতিফলন হিসেবে গণভোট আয়োজনকে অস্বীকার করছে এবং জুলাই বিপ্লবের জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না। টঙ্গীর শহীদ আব্দুল মালেক মিলনায়তনে শুক্রবার আয়োজিত গাজীপুর মহানগরী শাখার রুকন সম্মেলনে তিনি এ হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। জামায়াত আমির বলেন, সরকার যদি একই ধারায় চলতে থাকে, তবে তাদের পরিণতিও আগের সরকারের মতোই হবে।
সম্মেলনে তিনি গত নির্বাচনের আগের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও বর্তমান পরিস্থিতির বৈপরীত্য তুলে ধরেন। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, অতীতে একটি দল প্রচার চালিয়েছিল যে নির্বাচন সম্পন্ন হলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, কিন্তু বাস্তবে সমস্যা বহুগুণ বেড়েছে। মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিতের বদলে সমাজজুড়ে দুর্নীতি, অনিয়ম এবং ন্যায়বিচারের অভাব প্রকট হয়েছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, শিক্ষা ও বিচার বিভাগে বর্তমানে দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতি আগের চেয়েও গভীর হয়েছে। অথচ বর্তমানে সমস্যাগুলো দ্বিগুণ হারে বেড়েছে। সমাজে দুর্নীতি, অনিয়ম ও অন্যায় ব্যাপকভাবে বেড়েছে।
২০২৪ সালের প্রেক্ষাপট টেনে তিনি বলেন, তরুণ সমাজসহ সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল বৈষম্যহীন ও শোষণমুক্ত এক নতুন বাংলাদেশ গড়ার। অথচ সরকার বৈষম্যের নতুন রূপ তৈরি করছে এবং শিক্ষাঙ্গনসহ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডেও লুটপাট ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ চলছে। জামায়াত আমির বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে মনে হচ্ছে, এক লুটেরার হাত থেকে আরেক লুটেরার হাতে ক্ষমতা ন্যস্ত হয়েছে। তবে জনগণ জামায়াতে ইসলামীকে একমাত্র নিরাপদ আশ্রয়স্থল মনে করে।’
রুকনদের দায়িত্ব ও আদর্শ নিয়ে তিনি বলেন, কোরআনের শিক্ষা ও ইসলামী আদর্শ ধারণ করে নফস নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। উত্তম চরিত্রের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘শুধু তলোয়ার দিয়ে ইসলাম কায়েম হয়নি। মহানবী (সা.)-এর উন্নত আচরণে মুগ্ধ হয়ে বিদায় হজে এক লাখ ২০ হাজার অমুসলিম ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।’ তাই সবাইকে ভালো আমল ও উত্তম আচরণের মাধ্যমে জীবন অতিবাহিত করার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে সুদকে হারাম হিসেবে উল্লেখ করে তিনি সকল প্রকার সুদি কারবার থেকে বিরত থাকার কঠোর নির্দেশনা দেন। সমাজের মানুষকে সম্মান করতে হবে এবং তাদের সঙ্গে ভালো আচরণ করতে হবে। তিনি বলেন, “শুধু তলোয়ার দিয়ে ইসলাম কায়েম হয়নি। তাই উত্তম আমলের মধ্য দিয়ে জীবনের সমাপ্তি হওয়া উচিত। কেউ সুদের সঙ্গে জড়িত থাকবেন না; সর্বাবস্থায় সুদ হারাম। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত আল্লাহর দাসত্ব করার জন্যই মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে। তাই আগামী স্থানীয় নির্বাচনে জান-প্রাণ দিয়ে জামায়াতের প্রার্থীকে বিজয়ী করতে হবে।
তিনি আরও যোগ করেন, মুসলমানদের অভ্যন্তরীণ ঐক্যের অভাব এবং রসুল (সা.)-এর আদর্শ থেকে বিচ্যুতি বিশ্বজুড়ে মুসলিম উম্মাহকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। গাজীপুরকে একটি শিল্পসমৃদ্ধ গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হিসেবে উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনে দলের প্রার্থীদের বিজয়ী করতে সর্বস্তরের নেতা-কর্মীদের মাঠে নামার নির্দেশ দেন। তিনি দৃঢ়ভাবে বলেন, দেশ ও জাতিকে উদ্ধার করার গুরুদায়িত্ব জামায়াতের ওপর এবং এ পথে যেকোনো বাধা মোকাবিলা করে আল-কোরআনের শাসন কায়েম করা হবে। নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, নিজেকে ও পরিবারকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে হবে। এখানে শিল্পমালিক, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ বসবাস করেন।
গাজীপুর মহানগর জামায়াতের আমির অধ্যাপক জামাল উদ্দিনের সভাপতিত্বে সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য অধ্যক্ষ আব্দুর রব, মাওলানা শাহজাহান, মাওলানা দেলোয়ার হোসেন, ড. খলিলুর রহমান মাদানি, জেলা আমির ড. জাহাঙ্গীর আলম ও সাবেক জেলা আমির আবুল হাশেম খান। এছাড়া মহানগর মহিলা বিভাগের সেক্রেটারি আমেনা বেগমসহ স্থানীয় কর্মপরিষদ, থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠান শুরু হয় মাওলানা আব্দুল হালিমের দারসুল কোরআনের মধ্য দিয়ে এবং পরে দেশীয় সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংসদের শিল্পীরা সংগীত পরিবেশন করেন।
