
জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার নাসিরপুর গ্রামের ৩০ বছর বয়সী গৃহবধূ রীতি খাতুন ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা (বিএম) শাখা থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন। ক্ষেতলাল পাইলট বালিকা স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিএম শাখা থেকে এই কৃতিত্ব অর্জন করেন তিনি। তিনি ওই গ্রামের আব্দুল আলিম মণ্ডল বাবুর স্ত্রী।
রীতি খাতুন ২০১০ সালে মোলামগাড়িহাট দ্বিমুখী উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন এবং পরের বছর ২০১১ সালে পারিবারিকভাবে তাঁর বিয়ে হয়। বর্তমানে তাঁর ১১ বছরের একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। সংসার ও সন্তানের নানা দায়িত্ব পালনের পরও মনে চেপে রাখা পড়ার ইচ্ছে বাস্তবায়নে এসএসসি পাসের প্রায় ১৪ বছর পর, ২০২৪ সালে তিনি পুনরায় কলেজে ভর্তি হন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রীতি ২০১০ সালে মোলামগাড়িহাট দ্বিমুখী উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। সংসার ও সন্তানের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি একসময় তার মনে আবারও পড়াশোনা শুরুর তীব্র সুপ্ত বাসনা জাগে। পড়াশোনার পাশাপাশি আমাকে সংসারের সব কাজও সমানভাবে সামলাতে হয়েছে।
নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে রোববার বেলা ১১টার দিকে রীতি খাতুন জানান, পুনরায় পড়াশোনা শুরু করায় প্রতিবেশীরা তাঁকে নিয়ে হাসিঠাট্টা ও উপহাস করত এবং বলত এই বয়সে কলেজে ভর্তি হয়ে টাকা নষ্ট করার দরকার কী। তবে তিনি মনে মনে সংকল্প করেছিলেন যেন উপহাসকারীরাই একদিন তাঁর প্রশংসা করে। সেই জেদ থেকেই গভীর রাতে লাইট জ্বালিয়ে কিংবা মোবাইলের আলোতে পড়াশোনা চালিয়ে যান। তাঁর এই সফলতায় স্বামীর মানসিক জোর, সার্বিক সহযোগিতা এবং শিক্ষকদের সমর্থন বড় ভূমিকা রেখেছে বলে জানান তিনি। ভবিষ্যতে আরও ভালো ফল করার জন্য সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন তিনি। সাফল্যের অনুভূতি জানিয়ে রীতি বলেন, আমার স্বামীর সহযোগিতা ও মানসিক জোর ছিল বলেই এই বয়সে এসে পুনরায় পড়াশোনা করার সুযোগ পেয়েছি। মনে মনে ভাবতাম, আজ যারা আমাকে নিয়ে উপহাস করছে, কাল যেন তারাই আমাকে নিয়ে প্রশংসা করে। আমার এই ফলাফলের পেছনে আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদেরও অনেক অবদান ও সমর্থন রয়েছে। সবার সহযোগিতায় আজ আমি ভালো ফল করতে পেরেছি। আগামী দিনে যেন আরও ভালো কিছু করতে পারি, সে জন্য সবার কাছে দোয়া চাই।
স্ত্রীর এই জয়ে উচ্ছ্বসিত স্বামী আব্দুল আলিম মণ্ডল বাবু বলেন, পড়াশোনায় প্রভূত আগ্রহ দেখেই স্ত্রীকে কলেজে ভর্তি করিয়েছিলেন। সংসারের সব কাজ সামলে কঠোর অধ্যবসায়ের মাধ্যমে স্ত্রীর পাওয়া এই ফলাফলে পুরো পরিবার গর্বিত ও আনন্দিত। রীতির শ্বশুর সাইদুর রহমানও ছেলের বউয়ের এই কৃতিত্বপূর্ণ অর্জনে গভীর আনন্দ ও গর্ব প্রকাশ করেছেন। তার এমন চমৎকার ফলাফলে পরিবারের সবাই আজ খুব খুশি।
ক্ষেতলাল পাইলট বালিকা স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ সাইফুল ইসলাম রীতির অর্জনকে অত্যন্ত প্রশংসনীয় ও অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, পারিবারিক নানা ব্যস্ততা ও বহুমুখী দায়িত্বের মাঝেও নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে তিনি যে সফলতা দেখিয়েছেন, তা শিক্ষার প্রতি সুগভীর আগ্রহের প্রমাণ দেয় এবং সমাজের অন্যদের জন্য এক বড় অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে। আমার এই পথচলায় সবচেয়ে বেশি অনুপ্রেরণা দিয়েছেন আমার স্বামী।’। তার অনুপ্রেরণা আমাকে অনেক সাহস জুগিয়েছে।
