
উপমহাদেশীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রবাদপুরুষ সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ ১৮৬২ সালের ৮ অক্টোবর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার শিবপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বিশ্বমঞ্চে শাস্ত্রীয় সংগীতকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া এই সাধক ‘সুরসম্রাট’, ‘পদ্মভূষণ’ ও ‘দেশীকোত্তম’-সহ অসংখ্য দেশি-বিদেশি সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। পণ্ডিত রবিশঙ্কর ও ওস্তাদ আলী আকবর খানের মতো বিশ্ববরেণ্য শিষ্য তৈরি এবং ‘মাইহার ঘরানা’র প্রতিষ্ঠাতা এই মহান সংগীতজ্ঞের কল্যাণে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ‘সংস্কৃতির রাজধানী’ হিসেবে পরিচিতি পেলেও নিজ জন্মভূমিতে তিনি চরম অবহেলার শিকার। সম্প্রতি ১৬৪তম জন্মবার্ষিকী নীরবে-নিভৃতে পার হয়েছে, যেখানে সরকারি বা বড় কোনো আয়োজনের অনুপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে কোনো বড় আয়োজন ছিলো না।
শিবপুরে ‘আলাউদ্দিন পল্লী’ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে আশির দশকে জেলা প্রশাসকের নামে ২২ শতক জমি রেজিস্ট্রি করে দেওয়া হলেও সেই প্রকল্প আলোর মুখ দেখেনি। এছাড়া প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের স্মৃতিকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা কেবল নথিপত্রেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। ওস্তাদজির নিজ হাতে গড়া খাঁ পাড়া জামে মসজিদ ও পৈতৃক ভিটা আজ বিলুপ্তির পথে এবং স্বজনদের কবরগুলো অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে। সুরসম্রাট ও তার শিষ্যদের উদ্যোগে আয়োজিত ঐতিহাসিক ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল, অথচ সেই মহান সাধকের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য আন্তর্জাতিক মানের কোনো মিউজিক একাডেমি বা জাদুঘর আজও গড়ে ওঠেনি। কেবল স্থানীয় একটি কলেজের উদ্যোগে সংক্ষিপ্ত আলোচনা সভা হয়। আর অরক্ষিত স্বজনদের কবর রক্ষায় নেই স্থায়ী ব্যবস্থা।
২০১৫ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের ‘সুরসম্রাট আলাউদ্দিন খাঁ সঙ্গীতাঙ্গন’ ও জাদুঘরে দুষ্কৃতকারীদের তাণ্ডব স্মৃতি সংরক্ষণের প্রচেষ্টায় বড় আঘাত হয়ে দাঁড়ায়। বর্তমানে স্থানীয় অনেক শিক্ষার্থীই তার সঠিক ইতিহাস সম্পর্কে অবগত নয়। জন্মদিনের সরকারি আয়োজন না থাকা নিয়ে জেলা প্রশাসক জানান, জন্মতারিখের বিষয়ে সর্বসম্মত কোনো নথি না থাকায় তারা কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত। তবে নবীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে প্রতিনিধি দল এলাকা পরিদর্শন করেছে এবং মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনা পেলে উপজেলা প্রশাসন স্মৃতি জাদুঘর নির্মাণে সহায়তা দিতে প্রস্তুত। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এলাকার স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের অনেকেই সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর সঠিক ইতিহাস জানে না। ২০১৫ সালে একদল দুষ্কৃতকারীর তাণ্ডবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের ‘সুরসম্রাট আলাউদ্দিন খাঁ সঙ্গীতাঙ্গন’ ও জাদুঘরটি পুড়ে ছাই হয়ে যায়। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ স্মৃতি জাদুঘর বা আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের কাজের অগ্রগতি বিষয়ে জানতে চাইলে নবীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে প্রতিনিধি দল এসে স্থান দেখে গেছেন তখন আমরা সহায়তা করেছি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি মো. আরজু বলেন, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ কেবল নবীনগরের নন, বরং পুরো উপমহাদেশের শাস্ত্রীয় সংগীতের আলোকবর্তিকা। তাকে অবহেলা করা মানে আমাদের সাংস্কৃতিক শিকড়কে অস্বীকার করা। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এই কিংবদন্তিকে যথাযথ সম্মান জানানো সময়ের দাবি। নবীনগরের সাবেক প্রেসক্লাবের সভাপতি আবু কামাল খন্দকারও দীর্ঘদিনের এই দাবি পূরণে শিবপুরে একটি পূর্ণাঙ্গ মিউজিক একাডেমি ও স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দেন, যাতে দেশ-বিদেশের শিল্পী ও গবেষকরা ওস্তাদজি সম্পর্কে জানার সুযোগ পান।
নবীনগর প্রেসক্লাবের বর্তমান সভাপতি মো. হোসেন শান্তি আক্ষেপ করে জানান, বিশ্বখ্যাত এই সংগীতসাধকের স্মৃতি সংরক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্রের কাজ বিলম্বিত হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। সংশ্লিষ্টদের সমন্বয়ের ঘাটতি এখানে স্পষ্ট। ওস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁ স্মৃতি সংসদের সভাপতি রানা শামীম রতন জানান, বহু বছর ধরে ৮ অক্টোবর স্থানীয়ভাবে জন্মদিন পালিত হয়ে আসছে এবং এবারও মসজিদে দোয়ার আয়োজন করা হয়েছে। সরকারিভাবে এই দিবস পালন না করায় স্থানীয়দের মধ্যে গভীর হতাশা বিরাজ করছে। নিজ জন্মভূমিতে এমন অবহেলা মেনে নেওয়া কষ্টকর বলে মনে করেন স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মীরা।
