
কুমিল্লার ছত্রখিল এলাকায় জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে আবু কাউছার নামে এক যুবদলকর্মী নিহত হওয়ার ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত তৌহিদুল ইসলামকে স্থানীয়রা আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছেন। শুক্রবার দিবাগত রাত একটার দিকে কুমিল্লার নুরপুর এলাকা থেকে কোতোয়ালি মডেল থানা-পুলিশ ও জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) তাঁকে উদ্ধার করে। গ্রেপ্তারের সময় তাঁর পরনের জামায় রক্তের দাগ ছিল বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। রাত সাড়ে তিনটার দিকে সোহাগ বলেন, ‘রাত ১২টার দিকে আমি বাসায় ফিরছিলাম। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করেন, ডেন্টিস্ট বেলালের বাসা কোন দিকে। সেই জামাটাই তাঁর গায়ে ছিল, জামায় রক্তের দাগ তখনো লেগে ছিল। আমি মোবাইলে থাকা ছবির সঙ্গে মিলিয়ে বললাম, আপনি তো খুনি। আমি একটু দূরে সরে গিয়ে তাঁকে ইট ছুড়ি। এর মধ্যে আমি চিৎকার করলে আশপাশের মানুষ জড়ো হয়ে তাঁকে ধরে ফেলেন।’। তখন বুঝতে পারি, ডিবি পুলিশও তাঁকে ধরার কাছাকাছি ছিল।’। দুটি ভিডিওতেই তাঁকে লুঙ্গি পরা ও খালি গায়ে দেখা গেছে। সেই জমির দখল নিয়ে শামীমের সঙ্গে তৌহিদুল ও তাঁর লোকজনের বিরোধ চলছিল।
আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করে কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার জানান, ঘটনার পর থেকেই তৌহিদুল আত্মগোপনে ছিলেন। জনতার হাতে ধরা পড়ার পর তাঁকে প্রথমে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং বর্তমানে তিনি পুলিশি হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদের মুখে রয়েছেন। এই ঘটনায় কাউছারের জানাজা শেষে পরিবার মামলা দায়ের করবে বলে প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফেসবুকে ঘটনার (কাউছারকে কুপিয়ে হত্যা) তাঁর একটা ছবি দেখেছিলাম।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়রা জানিয়েছেন, নুরপুর পূর্বপাড়ায় কাজী বাড়ির সামনে এক অটোরিকশা থেকে নামার সময় তৌহিদুলকে শনাক্ত করেন সোহাগ হোসেন নামে স্থানীয় এক যুবক। তিনি জানিয়েছেন, ঘটনার ভিডিওচিত্রে দেখা পোশাকটিই অভিযুক্তের গায়ে ছিল এবং তাঁর জামায় তখনও রক্তের ছাপ স্পষ্ট ছিল। সোহাগ তাঁকে আটকাতে গেলে তৌহিদুল কোমর থেকে ছোরা বের করে আক্রমণের চেষ্টা করেন, তবে পাল্টা ধাওয়ায় অভিযুক্ত পালিয়ে পাশের একটি বাড়ির টিনের ছাদে আশ্রয় নেন। পরে বিপুলসংখ্যক জনতা জড়ো হয়ে তাঁকে ঘিরে ফেলে এবং পিটুনি দেয়। সোহাগ আরও বলেন, ‘একপর্যায়ে তিনি দৌড়ে পাশের বাড়ির একটি মুরগির ঘরের ছাদে উঠে যান। কুমিল্লায় যুবদল কর্মীকে কুপিয়ে হত্যা, অভিযুক্তের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ। লোহার সিঁড়ি বেয়ে কয়েকজন ছাদে উঠে তাঁকে টেনেহিঁচড়ে নামানোর চেষ্টা করেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিওতে দেখা যায়, বিক্ষুব্ধ লোকজন তৌহিদুলকে লাঠি দিয়ে পেটানোর পাশাপাশি ছাদে ও নিচে দফায় দফায় মারধর করছে। পুলিশ আসার আগপর্যন্ত স্থানীয়রা তাঁকে অবরুদ্ধ করে রাখেন। ভিড় সামলে পুলিশকে তাঁকে উদ্ধারে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে। ভিড় বেশি থাকায় তাঁকে দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পুলিশের হেফাজতে নিতে বেগ পেতে হয়। এ সময় ডিবির সদস্যদেরও তাঁকে নিজেদের হেফাজতে নিতে চেষ্টা করতে দেখা যায়।
এর আগে শুক্রবার দুপুরে গোমতী নদীর উত্তর পাড়সংলগ্ন ছত্রখিল এলাকায় এই হামলার ঘটনা ঘটে। নিহত কাউছারের স্বজনদের ভাষ্যমতে, জমি নিয়ে বিরোধের জের ধরে শামীম হোসেনের সঙ্গে তৌহিদুল ও তাঁর সঙ্গীদের বিবাদ ছিল। মীমাংসার কথা বলে ফোন করে কাউছার ও শামীমকে ঘটনাস্থলে ডেকে আনা হয়। সেখানে পৌঁছানোর পরপরই ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাঁদের ওপর হামলা চালানো হয়। এতে কাউছারের ঘাড়ে ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে গভীর ক্ষত তৈরি হয় এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। হামলায় অটোরিকশাচালক মাসুমও আহত হয়েছেন।
নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, এটি পরিকল্পিত একটি হত্যাকাণ্ড ছিল। ঘটনার সময় তৌহিদুলের হাতে দা এবং অন্যদের হাতে ছুরি ছিল। হামলার পর তৌহিদুল ও তাঁর ভাই তানজিলসহ জড়িত ব্যক্তিরা দুটি মোটরসাইকেলে করে সীমান্তের দিকে পালিয়ে যান বলে দাবি স্বজনদের।
নিহত আবু কাউছার কুমিল্লার কাপ্তান বাজার এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। স্থানীয় যুবদল নেতাদের তথ্যমতে, তিনি ৪ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের কর্মী হিসেবে পরিচিত ছিলেন, যদিও তাঁর আনুষ্ঠানিক কোনো পদপদবি ছিল না। তবে নিহত কাউছারের বড় ভাই কবির হোসেন কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা যুবদলের সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত তৌহিদুল বা তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আর কারা জড়িত রয়েছে, তা নিশ্চিত হতে তদন্ত চলছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে তৌহিদুল বা তাঁর পরিবারের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। কুমিল্লা মহানগর যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক খলিলুর রহমান গতকাল বলেছিলেন, কাউছার একসময় কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা যুবদলের সদস্য ছিলেন।
